মূলঃ যুবায়ের আলী যাঈ 

ভাষান্তরঃ আবূ মুবাশশির আহমাদ বিন আব্দুত তাওয়াব আনসারী (আহমাদুল্লাহ সৈয়দপুরী)

 

بسم الله الرحمن الرحيم

অনুবাদকের নিবেদন

ইসলামে তাকলীদের বিধান গ্রন্থটির পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ হাদীস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এ দেয়া হয়েছিল। এটি প্রথমে তাহরীকে প্রকাশ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বই আকারে মুদ্রিত হয়। কিন্তু অযৌক্তিকভাবে অত্র গ্রন্থ হতে ৫১ পৃষ্ঠার শেষাংশ হতে ৮৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বাদ দেয়া হয়েছে। যা বইটির মর্যাদাকে খাটো করেছে। সেই সাথে পাঠকদেরকে অত্যন্ত মূল্যবান আলোচনা হতে মাহরূম করেছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। সে জন্যই আমরা পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ পাঠকদের জন্য প্রকাশ করছি। এটি পাঠককে আরো বেশী জ্ঞান দান করবে ইনশাআল্লাহ।

বিনীত
অনুবাদক

 

ভূমিকা

الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام علي رسوله الأمين، أما بعد

চোখ বন্ধ করে, চিন্তা-ভাবনা ছাড়া, দলীল ও প্রমাণ ব্যতীত নবী ব্যতিরেকে অন্য কারো কথা মানাকে (এবং সেটাকে নিজের উপর আবশ্যিক মনে করাকে) তাকলীদ (মুতলাক বা নিঃশর্ত তাকলীদ) বলা হয়।
তাকলীদের একটি প্রকার হল তাকলীদে শাখসী। যাতে মুকাল্লিদ প্রকারান্তরে (আমলের ক্ষেত্রে) এই বিশ্বাস পোষণ করে যে, ‘মুসলমানদের উপর চার ইমামের (মালেক, শাফেঈ, আহমাদ ও আবূ হানীফা) মধ্য থেকে শুধুমাত্র একজন ইমামের (যেমন পাক-ভারতে ইমাম আবূ হানীফার) (দলীলবিহীন ও ইজতিহাদী রায় সমূহের) তাকলীদ ওয়াজিব। আর অবশিষ্ট তিন ইমামের তাকলীদ হারাম’।
তাকলীদের এ দুটি প্রকার[১] বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত। যেমনটি কুরআন-হাদীস, ইজমা ও সালাফে সালেহীনের আসার দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে।
সম্মানিত উস্তাদ হাফেয যুবায়ের আলী যাঈ রহিমাহুল্লাহ তাকলীদের (শাখসী ও গায়ের শাখসী) খন্ডনে একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখেন, ‘আল-হাদীস’ (হাযরো) পত্রিকায় পাঁচ কিস্তিতে যেটি প্রকাশ করা হয়েছিল।[২]
এখন সকলের উপকারের জন্য উক্ত গবেষণাধর্মী প্রবন্ধটিকে সামান্য সংশোধন ও সংযোজন সহ সাধারণ মুসলমানদের কল্যাণের নিমিত্তে প্রকাশ করা হল।
আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন নিজ অনুগ্রহে মানুষদেরকে তাকলীদের অন্ধকার থেকে বের করে সালাফে সালেহীনের বুঝ অনুযায়ী কুরআন-হাদীস ও ইজমার উপর পরিচালিত করেন। আমীন!

وَاللهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
‘আল্লাহ সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান’ (মায়েদাহ ৫/৪০)।

জ্ঞাতব্য: আহলে হাদীস-এর (মুহাদ্দিসগণ ও তাদের অনুসারী সাধারণ জনগণ) তাকলীদপন্থীদের (যেমন দেওবন্দী, ব্রেলভী ও তাদের মত অন্য লোকদের) সাথে ঈমান, আকীদা এবং উসূলের পর একটি মৌলিক মতপার্থক্য হল তাকলীদে শাখসী বিষয়ে। তাকলীদপন্থী আলেমগণ এই মৌলিক মতভেদপূর্ণ বিষয়টি থেকে পালানোর পথ বেছে নিতে গিয়ে চতুরতার সাথে তাকলীদে মুতলাকের উপর আলোচনা-পর্যালোচনা ও বাহাস-মুনাযারা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু কখনো তাকলীদে শাখসী বিষয়ে আলোচনা-বিতর্ক এবং তাহকীকের জন্য প্রস্তুত হন না। আশরাফ আলী থানবী সাহেব যার পা ধোয়া পানি পান করা (দেওবন্দীদের নিকটে) আখেরাতে নাজাতের কারণ[৩], তিনি বলেছেন, ‘কিন্তু তাকলীদে শাখসীর উপর তো কখনো ইজমাও হয়নি’।[৪]
তাকলীদে শাখসী সম্পর্কে মুহাম্মাদ তাকী ওসমানী দেওবন্দী সাহেব লিখেছেন, ‘এটি কোন শারঈ বিধান ছিল না। বরং একটি ইনতেযামী ফতওয়া ছিল’।[৫]
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, এই শরীয়ত বিবর্জিত বিধানকে ঐ লোকগুলি নিজেদের উপরে ওয়াজিব আখ্যা দিয়েছেন এবং কুরআন-সুন্নাহ থেকে দূরে সরে থেকেছেন।
আহমাদ ইয়ার নাঈমী (ব্রেলভী) লিখেছেন, ‘শরীয়ত ও তরীকত দুটিরই চার চারটি সিলসিলা অর্থাৎ হানাফী, শাফেঈ, মালেকী, হাম্বলী। এভাবে কাদেরী, চিশতী, নকশাবন্দী, সোহরাওয়ার্দী। এ সকল সিলসিলা একেবারেই বিদাত’।[৬]
দুঃখের বিষয় এসব লোক নিজেদের বিদাতী হওয়া স্বীকার করা সত্ত্বেও বিদাতকে ভাগ করে কিছু বিদআতকে নিজের বুকের উপরে সাজিয়ে বসে আছেন।
এক্ষণে তাকলীদ (শাখসী ও গায়ের শাখসী) বিষয়ে দলীলভিত্তিক বিস্তারিত খন্ডনের জন্য এ গ্রন্থটি ‘দীন (ইসলাম) মেঁ তাকলীদ কা মাসলা’ অধ্যয়ন শুরু করুন। অমা আলাইনা ইল্লাল বালাগ।
-ফযলে আকবর কাশ্মীরী (১৩ই রবীঊল আউয়াল ১৪২৭ হি.)।

 

 

بسم الله الرحمن الرحيم

ইসলামে তাকলীদের বিধান

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হৌক তাঁর বিশ্বস্ত রাসূলের উপর। অতঃপর আহলে হাদীস ও তাকলীদপন্থীদের মাঝে একটি মৌলিক মতভেদপূর্ণ বিষয় হল তাকলীদ। এই প্রবন্ধে (গ্রন্থে) তাকলীদের মাসলার পর্যালোচনা এবং শেষে মাস্টার মুহাম্মাদ আমীন উকাড়বী দেওবন্দী সাহেবের সংশয় ও ভুল-ভ্রান্তিগুলোর জবাব পেশ করা হল।
তাকলীদের উপর আলোচনা করার পূর্বে এর অন্তর্নিহিত মর্ম জানা অত্যন্ত জরুরী।

 

 

তাকলীদের আভিধানিক অর্থ

একটি প্রসিদ্ধ অভিধান ‘আল-মুজামুল ওয়াসীত’-এ লেখা আছে,
وَقَلَّدَ فُلاَنًا : اِتَّبَعَهُ فِيْمَا يَقُوْلُ أَوْ يَفْعَلُ مِنْ غَيْرِ حُجَّةٍ وَلاَ دَلِيْلٍ
‘সে অমুক ব্যক্তির তাকলীদ করল : দলীল ও প্রমাণ ছাড়া তার কথা বা কাজের আনুগত্য করল’।[৭]
দেওবন্দীদের নির্ভরযোগ্য অভিধান ‘আল-কামূসুল ওয়াহীদ’-এ লিখিত আছে- فلانا…قلد ‘তাকলীদ করা, বিনা দলীলে অনুসরণ করা, চোখ বন্ধ করে কারো পিছনে চলা’।[৮]

التقليد : ‘চিন্তা-ভাবনা না করে বা বিনা দলীলে (১) অনুসরণ (২) অনুকরণ (৩) সোপর্দকরণ’।[৯]
‘মিসবাহুল লুগাত’[১০] গ্রন্থে লেখা আছে, وقلده فى كذا‘চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সে তার অমুক কথার অনুসরণ করেছে’।
খ্রিস্টানদের ‘আল-মুনজিদ’ অভিধানে আছে, قلده فى كذا ‘কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই কারো অনুসরণ করা’। [১১]
‘হাসানুল লুগাত (জামে) ফারসী-উর্দূ’ অভিধানে লিখিত আছে, ‘বিনা দলীলে কারো অনুসরণ করা’।[১২]
‘জামেউল লুগাত’ (উর্দূ) অভিধানে আছে, ‘তাকলীদ : আনুগত্য করা, পদাঙ্ক অনুসরণ করা, তদন্ত ছাড়াই কারো অনুসরণ করা’। [১৩]
অভিধানের এ সকল সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যাসমূহের সংক্ষিপ্তসার এই যে, (দীনের মধ্যে) চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই চোখ বন্ধ করে, দলীল-প্রমাণ ব্যতীত এবং চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই কোন ব্যক্তির (যিনি নবী নন) অনুসরণ ও আনুগত্য করাকে তাকলীদ বলা হয়।
জ্ঞাতব্য: অভিধানে তাকলীদের আরো অর্থ আছে। তবে দীনের মধ্যে তাকলীদের এটাই মর্ম, যা উপরে বর্ণনা করা হল।
 

পাদটীকা

[১] তাকলীদ দুই প্রকার (১) তাকলীদে শাখসী (২) তাকলীদে মুতলাক তথা নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির তাকলীদের পরিবর্তে একেক মাসলায় একেকজন ইমামের তাকলীদ করা। তাকলীদে মুতলাক এবং তাকলীদে গায়ের শাখসী একই জিনিস। নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির তাকলীদ করাকে ‘তাকলীদে শাখসী’ বলা হয়। -অনুবাদক।

[২] সংখ্যা ৮-১২।

[৩] তাযকিরাতুর রশীদ ১/১১৩ পৃ.।

[৪] ঐ, ১/১৩১ পৃ.।

[৫] তাকলীদ কী শারঈ হায়ছিয়াত (ষষ্ঠ সংস্করণ, ১৪১৩ হিঃ), পৃ.  ৬৫।

[৬] জা-আল হক (পুরাতন সংস্করণ) ১/২২২, ‘বিদাতের প্রকারভেদ সমূহের পরিচয় ও আলামত’।

[৭] আল-মুজামুল ওয়াসীত (ইস্তাম্বুল, তুরস্ক : দারুদ দাওয়াহ) পৃ. ৭৫৪।

[৮] আল-কামূসুল ওয়াহীদ (লাহোর, করাচী : ইদারায়ে ইসলামিয়াত) পৃ. ১৩৪৬।

[৯] ঐ।

[১০] আল-কামূসুল ওয়াহীদ (লাহোর, করাচী : ইদারায়ে ইসলামিয়াত) পৃ. ৭০১।

[১১] আল-মুনজিদ (আরবী-উর্দূ) (করাচী : দারুল ইশা‘আত), পৃ. ৮৩১।

[১২] হাসানুল লুগাত, পৃ. ২১৬।

[১৩] জামে‘উল লুগাত, (করাচী : দারুল ইশা‘আত), পৃ. ১৬৬।