মূলঃ আবূ মুবাশশির আহমাদ বিন আব্দুত তাওয়াব আনসারী (আহমাদুল্লাহ সৈয়দপুরী)

 ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য। যিনি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক। অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর।
কতিপয় আলেম বিভিন্ন অগ্রহণযোগ্য বর্ণনা দ্বারা নারী-পুরুষের সালাতে পদ্ধতিগত কিছু পার্থক্য নিরূপণের চেষ্টা করেন। যেমন বঙ্গানুবাদ ‘বেহেশতী জেওর’ গ্রন্থে ১১টি পার্থক্য উল্লেখ করা হয়েছে।(মোকাম্মাল মোদাল্লাল বেহেশতী জেওর (হামিদিয়া লাইব্রেরী লিমিটেড, তৃতীয় সংস্করণ, ফেব্রæয়ারী ২০০৪ইং) পৃ. ১১৬-১১৭।)
ভারতের প্রখ্যাত আহলে হাদীস শায়েখ, মুনাযির আনওয়ারুল হক ফায়যী বলেন, ‘দেওবন্দীগণ পুরুষ ও মহিলার সালাতের পদ্ধতিগত প্রায় এক ডজন পার্থক্য করেছেন। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহ, এমনকি কোন সাহাবী থেকেও বিশুদ্ধ সূত্রে তার প্রমাণ পেশ করতে পারেননি; বরং তা কুরআন-সুন্নাহ্র পরিপন্থী। তাই সালেহ আল-ফাওযান, আব্দুল আযীয আলে আশ-শায়েখ ও ইবনু বায প্রমুখাদি সৌদী ফাতাওয়ার কমিটির মুফতীগণ বলেন, ‘পুরুষ ও মহিলার সালাতে পদ্ধতিগত কোন পার্থক্য নেই’।(ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ৬/২৪৮)
নূহ হানাফীর প্রিয়তম পুত্র বিশ্ব বরেণ্য মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দীন আলবানী ‘আসলু সিফাতি সালাতিন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)’ গ্রন্থের উপসংহারে বলেন, ‘নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সালাতের যে বিবরণী ও পদ্ধতি উল্লেখ করা হল এতে নারী-পুরুষ সবাই সমান। ঐ সকল পদ্ধতির কিছু অংশেও নারীদের স্বাতন্ত্র্য রয়েছে এ দাবীর স্বপক্ষে (কুরআন ও) সুন্নাহ্তে কিছুই উদ্ধৃত হয়নি। বরং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ‘তোমরা ঐভাবে সালাত আদায় কর যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছ’-এ বাণীর সাধারণ ভঙ্গী তাদেরকেও শামিল করে’।
ইমাম আবূ হানীফার উস্তাদ হাম্মাদ, তাঁর উস্তাদ দেওবন্দীদের শিরোমণি ইবরাহীম নাখাঈ থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মহিলা সালাতে ঐভাবে বসবে যেভাবে পুরুষ বসে’।(মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/২৭৮৮; তাওযীহুল আহকাম ২/৮৪)
মুহতারাম শায়েখ (আনওয়ারু হক ফায়যী) আরো বলেন, ‘সালাতে যে সব বিষয়ে মহিলারা স্বতন্ত্র’ অত্র শিরোনামে দেওবন্দী সাহেব (নাসিরুদ্দীন চাঁদপুরী) নারী-পুরুষের সালাতে ১৩টি পার্থক্য উল্লেখ করেছেন। এটা ইবনে নুজাইম (মৃ. ৯৭০ হি.)-এর মত। আর যায়লাঈ হানাফী ১০টি বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে।(হানাফী কেল্লা পৃ. ৮২, ৮৩) এই যায়লাঈ নাসবুর রায়াহ গ্রন্থের লেখক নন; বরং তিনি তাবয়ীনুল হাক্কাইক গ্রন্থের প্রণেতা (মৃ. ৭৪৩ হি.)। এই যায়লাঈ দাবী করেছেন ১০টি, আর মাত্র একটি বিষয়ে সনদ বিহীনভাবে (যঈফ-মুরসাল) হাদীস পেশ করেছেন।(তাবয়ীনুল হাক্কাইক ১/১১৮। [হানাফী কেল্লা নামী গ্রন্থটির লেখক একজন ভারতীয় দেওবন্দী আলেম। শায়খ আনওয়ারুল হক্ব ফায়যী হাফিযাহুল্লাহ অত্র গ্রন্থটির জবাবে ‘হানাফী কেল্লার পোষ্ট মরটেম’ শিরোনামে একটি অসাধারণ গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। যার প্রথম খন্ডটি প্রকাশিত হয়েছে।-লেখক])
আর ইবনু নুজাইম হানাফী ১৩টি দাবী করে অত্র যঈফ হাদীস ব্যতীত কোন হাদীস-ই উল্লেখ করেননি।(বাহরুর রায়েক্ব ১/৩৩৯) অকীলে আহনাফ, আমীন সফদর দেওবন্দী বলেন, ‘ইমাম বুখারী (মৃ. ২৫৬ হি.) এখানে এ হাদীস কেবলমাত্র সনদবিহীন ভাবে উল্লেখ করেছেন’। (তাজাল্লিয়াতে ছফদর ৪/৭২) সারফরায খান দেওবন্দী বলেন, ‘ইমাম বুখারী স্বপক্ষে দলীল প্রমাণ করতে গিয়ে এসব আসার (হাদীস)-এর সনদ পেশ করেন নি। আর সনদ বিহীন কথা দলীল হতে পারে না’। (আহসানুল কালাম ১/৩২৭; ইলমী মাকালাত সহ ১/২১৯)
যখন মুহাদ্দিস সম্রাট, ফকীহদের সর্দার ইমাম বুখারীর সনদ বিহীন কথা পরিত্যাজ্য তখন তাঁর ইন্তিকালের ৪শত বছর পরে জন্মগ্রহণকারী আহলুর রায় মুকাল্লিদদের সনদ বিহীন কথা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হবে? বরং এ সব সনদ বিহীন কথা বাতিল, তার সাথে কুরআন ও হাদীসের পরিপন্থী। মুফতী বশীর দেওবন্দী ‘মহিলাদের নামাযের ত্বরীকা’ শিরোনামে ইবনু নুজাইম হানাফীর কথা উল্লেখ করার পর মুফতী মুহাম্মাদ সালমান মনুছূরপুরী থেকে নারী-পুরুষের সালাতে ২৪টি পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন। অতঃপর লিখেছেন, ‘আমরা এখানে ঐ সমস্ত পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করবো না, কেননা ওগুলো ফিকাহ-এর কিতাবে বিস্তারিত লেখা আছে’।(হানাফীদের নামায ১২৯) এ সব সনদ বিহীন কথা পরিত্যাজ্য। বশীর সাহেব আপনি অনেক যঈফ-জাল হাদীছ এবং পবিত্র কুরআনের বিপরীত কথা লিখে বইয়ের নাম দিয়েছেন পবিত্র কুরআন এবং বিশুদ্ধ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু কুরআন-হাদীছ থেকে নারী পুরুষের সালাতে পার্থক্য কয়টি, তা উল্লেখ করেন নি; বরং লিখেছেন, ‘এগুলো ফিকাহ- এর কিতাবে বিস্তারিত লেখা আছে’। তাই বলব ফিকাহ্র কোন্ কিতাবে বিস্তারিত লেখা আছে? দয়া পূর্বক আপনার একটু মূল্যবান সময় বের করে জনগণের সম্মুখে তা পেশ করবেন।
অতঃপর মুহতারাম শায়েখ আরো বলেন, ‘যায়লাঈ হানাফীর মতে নারী-পুরুষের সালাতে পার্থক্য ১০টি আর ইবনু নুজাইম-এর মতে ১৩টি। আর সালমান মনসূরপুরীর নিকটে ২৪টি। কে বড় ফকীহ? কার কথা সত্য?
হানাফীদের সালাত থেকে প্রতীয়মান হয় ২৪টি আর ‘হানাফী কেল্লা’ (গ্রন্থটি) থেকে প্রতীয়মান হয় ১৩টি। কে বড় মুফতী? মুফতী তো হবে ফকীহ। মুকাল্লিদ মুফতী হতে পারে না। বশীর দেওবন্দী সালমান মনসূরপুরীর মুকাল্লিদ না ইবনু নুজাইমের আর নাসিরুদ্দীন দেওবন্দী যায়লাঈর না ইবনু নুজাইমের মুকাল্লিদ? ইমাম আবূ হানীফা, আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদ থেকে কেন পার্থক্য উল্লেখ করছেন না? তাহলে কি ইদানীং দেওবন্দীগণ শাখা-প্রশাখাতেও তিন তিনজন ইমামকে পরিত্যাগ করে অন্যদের মুকাল্লিদ হয়ে গেলেন নাকি নিজেরা ইমাম হওয়ার প্রচেষ্টা করছেন? প্রকাশ থাকে যে, দেওবন্দীগণ অনেক আগেই আকীদা ও উসূলে (মূলনীতিতে) ইমাম আবূ হানীফাকে বর্জন করেছেন। প্রিয় পাঠক! দেওবন্দীদের জিজ্ঞাসা করুন তাদের আকীদা ও মূলনীতি সঠিক না ইমাম আবূ হানীফার।(বিস্তারিত দেখুন : হানাফী কেল্লার পোষ্ট মর্টেম পৃ. ৩৩৯-৩৪১)
উপরোল্লিখিত বক্তব্য দ্বারা প্রতীয়মান হল যে, নারী-পুরুষের সালাতের পার্থক্যসমূহ একেকজন একেকভাবে উপস্থাপন করেছেন। এর কোন নির্ধারিত সংখ্যা হানাফীদের কাছে নেই। কারণ এগুলি পরবর্তীতে উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর কোন গ্রহণযোগ্য ভিত্তি কুরআন, হাদীসে নেই।
সাধারণত মাযহাবী আলেমগণ মারফূ, মাওকূফ ও মাকতূ-এই তিন প্রকার বর্ণনা উপস্থাপন করেন। আমরা সেগুলির পর্যালোচনা পেশ করে সেগুলির ত্রæটি-বিচ্যুতিগুলি যথাসম্ভব অল্প কথায় উল্লেখ করেছি। যেন বর্ণনাগুলির অগ্রহণযোগ্যতা স্পষ্ট হয়। ইমামদের উক্তি, ফাতাওয়াসমূহ হুবহু নকল করা হয়েছে। আংশিক নকল করা হলে তাতে আসল বক্তব্য উহ্যও থেকে যেতে পারে বিধায় পুরো বক্তব্যই উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মুকাল্লিদ আব্দুল মতীন সাহেব রফউল ইদায়েন না করার একটি যঈফ হাদীসের আলোচনায় লিখেছেন, ‘তিরমিযী শরীফের টীকায় শায়খ আহমদ শাকের (তিনি মিসরের কাজী ছিলেন) বলেছেন, এ হাদীসটিকে ইবনে হাযমসহ অনেক হাফেজে হাদীস সহীহ আখ্যা দিয়েছেন। আসলেও এটি সহীহ। অনেকে এর যেসব ক্রটির কথা বলেছেন সেগুলো বাস্তবে কোন ত্রæটি নয়’। (দলিলসহ নামাযের মাসায়েল পৃ. ২০৭)
তিনি এখানেই ইতি টেনেছেন। এবার আসুন পরের লাইনে শাইখ আহমাদ শাকের রহিমাহুল্লাহ কি বলেছেন তা দেখা যাক। তিনি বলেছেন, কিন্তু এটি অন্যান্য স্থানে রফউল ইদায়েন বর্জনের নির্দেশনা দেয় না। কেননা এটি ‘না বোধক’। আর রফউল ইদায়েনের উপর নির্দেশকারী হাদীসগুলি ‘হাঁ বোধক’। ‘হাঁ বোধক’ (হাদীস) অগ্রগণ্য হয়। এছাড়াও রফউল ইদায়েন করা সুন্নাত। তিনি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একে বর্জন করেছেন একবার বা একাধিকবার। তবে অধিকাংশ সময়ের কাজটিই হল সুন্নাত। আর সেটি হল, রুকূর সময় ও রুকূ হতে উঠার সময় রফউল ইদায়েন করা।(তিরমিযী (দারুল ফিকর) হা/২৫৭ এর টীকা, ২/৪১)
চিন্তা করুন! মুকাল্লিদ সাহেব শায়খ আহমাদ শাকেরের মূল বক্তব্যটি যদি এভাবে দিতেন তবে শায়খের উক্তির মর্মটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেত। কিন্তু তিনি তা করেন নি।

মুকাল্লিদ আব্দুল মালেক সাহেবের প্রবন্ধ নিয়ে কিছু কথা

মাযহাবী ভাইদের পেশকৃত দলীলসমূহ সম্পর্কে আলোকপাত করার পূর্বে দেশের স্বনামধন্য মুকাল্লিদ আব্দুল মালেক সাহেবের প্রবন্ধটির কতিপয় উক্তি নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা জরূরী।
তিনি ‘মহিলাদের নামাযের পদ্ধতি’-নামী প্রবন্ধের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘গ্রহণযোগ্য কোন দলীল ও যুক্তির ওপর ভিত্তি না করেই কোন কোন মহলের পক্ষ থেকে নারী-পুরুষের নামাযের এই পার্থক্য অস্বীকার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলেই এ বিষয়ে দলীল ও যুক্তিভিত্তিক কিছু আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে’।(নবীজীর নামায পৃ. ৩৭৫)
পর্যালোচনা : তিনি নিজেই কোন গ্রহণযোগ্য দলীল পেশ করেননি। নারী-পুরুষের নামাযের পদ্ধতিগত পার্থক্য কোন সহীহ দলীল দ্বারা যদি তিনি দেখাতেন তবে অবশ্যই আমরা মেনে নিতাম। কিন্তু যেহেতু আমাদের জানামতে এই মর্মে কোন সহীহ দলীল নেই, সেহেতু আমরা এটি মেনে নিয়েছি যে, নারী-পুরুষের সালাতের পদ্ধতিগত কোন পার্থক্য নেই। কেউ যদি দাবী করেন যে, পার্থক্য আছে; তবে তাকে তার দাবীর স্বপক্ষে গ্রহণযোগ্য দলীল পেশ করতে হবে।
আমরা মুহতারাম আব্দুল মালেক সাহেবকে পরবর্তীতে সহীহ দলীল পেশ করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাই। ইনশাআল্লাহ আমরা মেনে নিব (যদি তা গ্রহণযোগ্য প্রমাণিত হয়)।
এখানে কয়েকটি প্রশ্ন জাগে।-
(১) ‘দলীল’ শব্দ দ্বারা তিনি কাকে বা কোন্ বস্তুকে বুঝাচ্ছেন? নিজের মুকাল্লাদ (তাক্বলীদকারী ব্যক্তিকে ‘মুক্বাল্লিদ’ বলা হয়। আর যে ইমামের তাক্বলীদ করা হয় তাকে ‘মুক্বাল্লাদ’ বলা হয়। এখানে ‘মুক্বাল্লাদ’ শব্দটি দ্বারা ইমাম আবূ হানীফা রহেমাহুল্লাকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে) ইমামকে? নাকি কুরআন, হাদীস ইত্যাদিকে? যদি বলা হয়, কুরআন-হাদীসকে তিনি ‘দলীল’ বুঝিয়েছেন, তবে প্রশ্ন হল, মুকাল্লিদরাও কি কুরআন-হাদীস থেকে দলীল বের করার যোগ্যতা রাখেন? তারাও কি কুরআন-হাদীস অনুধাবন করার যোগ্যতা রাখেন এবং সেখান থেকে মাসআলা উদ্ভাবন করার ইলম রাখেন? আশা করি এ বিষয়ে স্বীয় মুকাল্লাদ ইমামের ফতওয়া ও বিধানসমূহের মাধ্যমে আমাদেরকে জবাব প্রদান করা হবে।
‘নবীজীর নামায’ গ্রন্থে আছে, মুকাল্লিদ যেহেতু ইজতিহাদের যোগ্যতার অধিকারী নয় তাই সে মুজতাহিদের গবেষণা ও সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখে।(পৃ. ৮১) আব্দুল মালেক সাহেব কোন্ মুজতাহিদের প্রতি আস্থা রেখে তার প্রবন্ধে পেশকৃত হাদীস ও আসারগুলি উপস্থাপন করেছেন তা স্পষ্ট নয়।
(২) দলীলের সঙ্গা কি? এ বিষয়ে ইমাম আবূ হানীফা রহিমাহুল্লাহ প্রদত্ত সঙ্গা পেশ করার জন্য অনুরোধ রইল (যদি থাকে)। যদি ইমাম সাহেব হতে এই বিষয়ে কোন সঙ্গা না থাকে, তবে যেন সেটি স্বীকার করা হয়। আর মাওলানা সাহেব কিভাবে, কোথা হতে ‘দলীল’-এর সঙ্গা পেলেন তা যেন জানিয়ে দেন।
(৩) তিনি যুক্তির কথাও বলেছেন। কার যুক্তি? স্বীয় তাকলীদের শিকলে আবদ্ধ মগজ নিঃসৃত যুক্তি? নাকি ইমাম সাহেব থেকে গৃহীত যুক্তি? আশা করি এ বিষয়টিও পরিষ্কার করা হবে।
তিনি লিখেছেন-১ : ‘দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ মাসআলায় পুরুষ ও মহিলার হুকুম এক; কিন্তু এমন অনেক মাসআলা রয়েছে যেখানে মহিলাদের হুকুম পুরুষদের থেকে ভিন্ন’ (ঐ)।
পর্যালোচনা : তার মানে তিনি স্বীকার করলেন যে, অধিকাংশ মাসআলায় নারী-পুরুষের হুকুম এক। যে সকল মাসআলায় নারী-পুরুষের হুকুম এক তন্মধ্যে নারী-পুরুষের সালাতের পদ্ধতিও শামিল। তবে ক্ষেত্র বিশেষে সহীহ, হাসান হাদীস দ্বারা কিছু কিছু পার্থক্য করা হয়েছে যেগুলি দলীল দ্বারা স্পষ্ট। যেমন পুরুষরা ইমামের ভুল হলে তাকবীর বলবেন। কিন্তু নারীরা এমনটি করতে পারবেন না। বরং তারা হাতে হাত মেরে ভুল ধরিয়ে দিবেন ইত্যাদি।
তিনি লিখেছেন-২ : ‘কিন্তু মহিলাদের জন্য পথখরচ ছাড়াও হজ্জের সফরে স্বামী বা মাহরাম পুরুষের উপস্থিতি শর্ত’ (ঐ)।
পর্যালোচনা : এটি শুধু হজ্জের সাথেই নির্দিষ্ট তা কিন্তু নয়। বরং নারীদের একাকি সফর করা সর্বদাই নিষিদ্ধ। যেন তারা যাবতীয় উৎপাত থেকে যথাসম্ভব নিরাপদ থাকতে পারে। হাদীসে এসেছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا، أَنَّهُ : سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ : لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ، وَلاَ تُسَافِرَنَّ امْرَأَةٌ إِلَّا وَمَعَهَا مَحْرَمٌ ، فَقَامَ رَجُلٌ فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللهِ، اكْتُتِبْتُ فِي غَزْوَةِ كَذَا وَكَذَا، وَخَرَجَتِ امْرَأَتِي حَاجَّةً، قَالَ : اذْهَبْ فَحُجَّ مَعَ امْرَأَتِك-
ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কোন পুরুষ যেন অবশ্যই কোন (বেগানা) নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করে এবং কোন নারী যেন অবশ্যই মাহরাম সঙ্গী ব্যতীত ভ্রমণ না করে। (এ কথা শুনে) একজন ব্যক্তি দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! অমুক যুদ্ধে আমার নাম লিখিত হয়েছে এবং আমার স্ত্রী হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন। তিনি বললেন, তুমি যাও। তোমার স্ত্রীর সাথে হজ্জ কর।(বুখারী হা/৩০০৬)
বলাবাহুল্য, এটি হজ্জের অভ্যন্তরীন ইবাদতের সাথেও সম্পৃক্ত নয়। এটি মূলত পর্দা, নিরাপত্তা ইত্যাদির সাথে জড়িত।
তিনি লিখেছেন-৩ : ‘অথচ মহিলাদের জন্য ইহরাম অবস্থায়ও মাথা ঢেকে রাখা ফরয’।(ঐ)
পর্যালোচনা : এটা শুধু ইহরাম অবস্থায় নয়। বরং (বেগানা পুরুষদের সামনে) সর্বাবস্থায় নারীদের জন্য মাথা ঢেকে রাখা ফরয।
তিনি লিখেছেন-৪ : ‘হজ্জ পালনের সময় পুরুষ উচ্চ আওয়াযে তালবিয়া পাঠ করে; অথচ মহিলার জন্য নিম্ন আওয়াযে পড়া জরুরি।(ঐ)
পর্যালোচনা : শুধু হজ্জেই নয় বরং মহিলাদের কণ্ঠ সর্বাবস্থায় নি¤œগামী রাখতে বলা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এটিও পর্দার সাথে সংশ্লিষ্ট।
তিনি লিখেছেন-৫ : ‘মহিলা ইমাম ও খতীব হতে পারে না’।(পৃ. ৩৭৬)
পর্যালোচনা : ‘মহিলা ইমাম হতে পারবে না’-এই অংশটুকু ভুল। নারীরা নারীদের ইমাম হতে পারবেন। এ বিষয়ে ইমামদের ফতওয়াসমূহ তাহকীকসহ উপস্থাপন করা হল।-
(১) শায়খ যুবায়ের আলী যাঈ রহিমাহুল্লাহ বলেন, এই মাসআলায় ওলামায়ে কেরামদের মতানৈক্য আছে যে, নারী কি সালাতে মহিলাদের ইমাম হতে পারবেন নাকি পারবেন না? একটি জামাআত এর জায়েয হওয়ার প্রবক্তা।
একটি রেওয়ায়াতে এসেছে, وَكَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزُورُهَا فِي بَيْتِهَا وَجَعَلَ لَهَا مُؤَذِّنًا يُؤَذِّنُ لَهَا، وَأَمَرَهَا أَنْ تَؤُمَّ أَهْلَ دَارِهَا ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর (উম্মে ওয়ারাকাহ রাযিআল্লাহু আনহা) সাথে সাক্ষাতের জন্য তাঁর ঘরে যেতেন। তিনি তার জন্য একজন মুওয়াযযিন নিযুক্ত করেছিলেন। যিনি তার জন্য আযান দিতেন। আর তিনি তাঁকে (উম্মে ওয়ারাকাকে) হুকুম দিতেন যে, তিনি যেন তাদেরকে (স্বীয় এলাকা বা গোত্রের নারীদেরকে) সালাত পড়ান’।(সুনানে আবী দাঊদ হা/৫৯২, কিতাবুছ ছলাত, ‘নারীদের ইমামত’ অনুচ্ছেদ; তাঁর থেকে বাইহাক্বী বর্ণনা করেছেন, আল-খিলাফিইয়াত (পান্ডুলিপি) পৃ. ৪)
তাহকীক : সনদ হাসান। একে ইবনে খুযায়মাহ (হা/১৬৭৬) এবং ইবনুল জারূদ (আল-মুনতাক্বা হা/৩৩৩) সহীহ বলেছেন। এই হাদীসের প্রধান রাবী ওয়ালীদ বিন আব্দুল্লাহ বিন জুমাই সত্যবাদী, হাসানুল হাদীস। (তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৭৪৩২) ইনি সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থের রাবী এবং জমহূর মুহাদ্দিসদের কাছে আস্থাভাজন ও সত্যবাদী। সুতরাং তাঁর বিরুদ্ধে (আরোপিত) সমালোচনাটি প্রত্যাখ্যাত।
ওয়ালীদের উস্তাদ আব্দুর রহমান বিন খাল্লাদ: তিনি ইবনে হিব্বান, ইবনে খুযায়মাহ ও ইবনুল জারূদের নিকটে আস্থাভাজান, ছহীহুল হাদীস। সুতরাং তাঁর বিরুদ্ধে حاله مجهول (তার জীবনী অজ্ঞাত রয়েছে) সমালোচনাটি প্রত্যাখ্যাত।
লায়লা বিনতে মালেক (ওয়ালিদ বিন জুমাইর মাতা)-এর তাওছীক ইবনে খুযায়মাহ ও ইবনুল জারূদ তাঁর হাদীসকে ‘তাসহীহ’ (সহীহ আখ্যাদানের) দ্বারা করে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁর হাদীসও হাসান স্তরের চাইতে কম নয়।
অত্র হাদীসের মর্ম কি : এর জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করুন।-
প্রথমত : হাদীস হাদীসের ব্যাখ্যা ও তাফসীর বর্ণনা করে। এজন্য হাদীসের সকল সনদ ও মতনকে একত্রিত করে মর্ম অনুধাবন করতে হয়।
দ্বিতীয়ত : সালাফে সালেহীনগণ (মুহাদ্দিসীনে কেরাম, হাদীসের রাবীগণ) যে হাদীসের যে তাফসীর (ব্যাখ্যা) এবং মাফহূম (মর্ম) বর্ণনা করেছেন সেগুলিকে সর্বদাই (গুরুত্বসহকারে) পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। শর্ত হল, সালাফদের মধ্যে উক্ত মর্ম’র উপর মতানৈক্য (যেন) না হয়।
উম্মে ওয়ারাকা রাযিআল্লাহু আনহুর হাদীসটির উপর ইমাম ইবনে খুযায়মাহ রহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৩১১ হি.) নি¤েœাক্ত অনুচ্ছেদ বেঁধেছেন।-
بَابُ إِمَامَةِ الْمَرْأَةِ النِّسَاءَ فِي الْفَرِيضَةِ
‘ফরয সালাতে নারীর নারীদের ইমামতি করার অনুচ্ছেদ’।(ছহীহ ইবনে খুযায়মাহ হা/১৬৭৬, ৩/৮৯)
ইমাম আবূ বকর ইবনুল মুনযির নিশাপুরী রহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৩১৮ হি.) বলেছেন,
ذِكْرُ إِمَامَةِ الْمَرْأَةِ النِّسَاءَ فِي الصَّلَوَاتِ الْمَكْتُوبَةِ
‘ফরয সালাতসমূহে নারীর নারীদের ইমামতি করার বর্ণনা’।(আল-আওসাতু ফিস সুনানি ওয়াল ইজমা ওয়াল ইখতিলাফ  ৪/২২৬)
এই দুজন মুহাদ্দিসীনে কেরামদের অনুচ্ছেদ বাঁধা হতে প্রতীয়মান হল যে, এই হাদীসে أَهْلَ دَارِهَا (তার বাড়ির অধিবাসী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলেন মহিলাগণ, পুরুষগণ নন। মুহাদ্দিসীনে কেরামদের মধ্যে এই অনুচ্ছেদ বাঁধা সম্পর্কে কোন ইখতিলাফ নেই।
ইমাম আবুল হাসান আদ-দারাকুতনী রহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৩৮৫ হি.) বলেছেন, حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ الْعَبَّاسِ الْبَغَوِيُّ ثنا عُمَرُ بْنُ شَبَّةَ نا أَبُو أَحْمَدَ الزُّبَيْرِيُّ نا الْوَلِيدُ بْنُ جَمِيعٍ عَنْ أُمِّهِ عَنْ أُمِّ وَرَقَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَذِنَ لَهَا أَنْ يُؤَذَّنَ لَهَا وَيُقَامَ وَتَؤُمَّ نِسَاءَهَا আমাদেরকে আহমাদ ইবনুল আব্বাস আল-বাগাবী হাদীস বর্ণনা করেছেন। (তিনি বলেন) ওমর বিন শাব্বাহ আমাদেরকে হাদীস বলেছেন। (তিনি বলেন) আবূ আহমাদ আয-যুবায়রী আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। (তিনি বলেন) আল-ওয়ালীদ বিন জুমাই আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন তাঁর মাতা হতে, তিনি (তার মাতা) উম্মে ওয়ারাকা হতে যে, নিশ্চয়ই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে অনুমতি দিয়েছিলেন যে, তার জন্য আযান ও ইকামত বলা যাবে। এবং তিনি নিজের (বাসার, মহল্লার) নারীদের ইমামতি করবেন। (সুনানে দারাকুৎনী হা/১০৭১, ১/২৭৯, এর সনদ হাসান; ইবনুল জাওযী তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন, আত-তাহক্বীক্ব মাআত তানক্বীহ হা/৪২৪, ১/২৫৩, এবং তিনি একে যঈফ বলেছেন, অন্য সংস্করণ হা/৩৮৭, ১/৩১৩; ইবনে হাজার, ইতহাফুল মাহরাহ ১৮/৩২৩)
তাহকীক : এই রেওয়ায়াতটির সনদ হাসান। এর উপর আল্লামা ইবনুল জাওযীর সমালোচনাটি ভুল।
আবূ আহমাদ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবায়রী কুতুবে সিত্তার রাবী এবং জমহুর বিদ্বানদের নিকটে ছিক্বাহ ছিলেন। সুতরাং তিনি সহীহুল হাদীস তথা সহীহ হাদীস বর্ণনাকারী।
ইমাম ইয়াহ্ইয়া বিন মাঈন বলেছেন, ثقة তিনি সিকাহ। আবূ যুরআহ বলেছেন, صَدُوق তিনি সত্যবাদী। আবূ হাতেম আর-রাযী বলেছেন, তিনি হাদীসের হাফেয, ইবাদাতগুযার, মুজতাহিদ। তার কিছু ভুল রয়েছে। (আল-জারহু ওয়াত-তাদীল ৭/২৯৭)
ওমর বিন শাব্বাহ : صدوق له تصانيف তিনি সত্যবাদী। তার একাধিক গ্রন্থ রয়েছে। (তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৪৯১৮) বরং তিনি ছিকাহ। (তাহরীরু তাক্বরীবিত তাহযীব ৩/৭৫) হাফেয যাহাবী বলেছেন, ثقة তিনি সিকাহ। (আল-কাশিফ ২/২৭২)
আহমাদ ইবনুল আব্বাস আল-বাগাবী : তিনি সিকাহ ছিলেন। (তারীখে বাগদাদ ৪/৩২৯, রাবী নং ২১৪৪)
এই পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হতে প্রতীয়মান হল, এই সনদটি ‘হাসান লি-যাতিহ’। এই বিশুদ্ধ রেওয়ায়াতটি এই বিষয়টির উপর অকাট্য ফায়ছালা করে দিয়েছে যে, أَهْلَ دَارِهَا (তার বাড়ির অধিবাসী) দ্বারা উদ্দেশ্য উম্মে ওয়ারাকা নাযিআল্লাহু আনহার বাড়ী, মহল্লা ও গোত্রের নারীগণ, পুরুষরা নয়।
সতর্কীকরণ : এর দ্বারা প্রতীয়মান হল যে, উম্মে ওয়ারাকা (রা.)-এর পিছে তাঁর মুওআযযিন সালাত পড়তেন না।
এখানে এই বিষয়টি হয়রানীমূলক যে, খোরশেদ আলম নামী (?) কোন এক অধ্যাপক লিখেছেন, ‘এটি দারাকুতনীর নিজের উক্তি, হাদীনের বাক্য নয়। এটি তাঁর নিজস্ব অভিমত। সুনানে দারাকুতনী ব্যতীত হাদীসের কোন গ্রন্থে এই সংযোজনটি নেই। এজন্য এই সংযোজনকে দলীলরূপে পেশ করা যেতে পারে না’। (ইশরাক্ব ১৭/৫ (মে ২০০৫ইং) পৃ. ৩৮, ৩৯)
অথচ আপনারা এখনই অধ্যয়ন করেছেন যে, এটি হাদীসের বাক্য। দারাকুতনীর নিজস্ব কথা নয়। বরং রাবীদের বর্ণনাকৃত রেওয়ায়াতের উক্তি। তার ‘ইমাম দারাকুতনীর নিজস্ব অভিমত’ বলা ভুল। যে লোকেরা ‘রেওয়ায়াত’ ও ‘রায়’-এর মাঝে পার্থক্য করতে জানেন না, তারা কেন প্রবন্ধ লিখে উম্মতে মুসলিমার মধ্যে মতানৈক্য ও প্রোপাগান্ডা প্রসার করতে চান?
অবশিষ্ট রইল এই বিষয়টি যে, এই শব্দগুলি সুনানে দারাকুতনী ব্যতীত হাদীসের কোন গ্রন্থে নেই। তো নিবেদন হল যে, ইমাম দারাকুতনী সিকাহ, গ্রহণযোগ্য ইমাম ছিলেন।
শায়খুল ইসলাম আবুত তাইয়েব তাহের বিন আব্দুল্লাহ আত-তাবারী (মৃ. ৪৫০ হি.) বলেছেন, كان الدارقطني أمير المؤمنين فِي الحديث দারাকুতনী হাদীসে আমীরুল মুমিনীন ছিলেন। (তারীখে বাগদাদ ১২/৩৬, রাবী নং ৬৪০৪)
খত্বীব বাগদাদী রহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৩৬৩ হি.) বলেছেন, وكان فريد عصره، وقريع دهره، ونسيج وحده، وإمام وقته، انتهى إليه علم الأثر، والمعرفة بعلل الحديث، وأسماء الرجال، وأحوال الرواة، مع الصدق والأمانة، والثقة والعدالة، وقبول الشهادة، وصحة الاعتقاد، وسلامة المذهب তিনি তার যুগের অদ্বিতীয়, স্বীয় যামানার সরদার, অদ্বিতীয় বুননকারী (ইলমের সংগ্রাহক) এবং তার সময়ের ইমাম ছিলেন। ইলমে হাদীস, হাদীসের ক্রটি-বিচ্যুতি সম্পর্কের গভীর জ্ঞান, আসমাউর রিজাল এবং রাবীদের অবস্থাসমূহ অবগত হওয়া তার পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। তিনি সত্যবাদীতা, আমানত, ফিকহ, আদালাত (ও সাকাহাত), সাক্ষ্য কবুল হওয়া, বিশুদ্ধ আকীদা এবং নিরাপদ মাযহাবের অনুসারী হওয়ার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। (তারীখে বাগদাদ ১২/৩৬, রাবী নং ৬৪০৪, তারীখে দিমাশক্ব গ্রন্থে খত্বীব হতে বর্ণিত আছে, ‘এবং ছিক্বাহ ও আদালত সহকারে’)
হাফেয যাহাবী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, الإِمَامُ الحَافِظُ المُجَوِّدُ, شَيْخُ الإِسلاَمِ, عَلَمُ الجهَابذَةِ তিনি ইমাম, (হাদীসের) হাফেয, অত্যন্ত দানশীল, শায়খুল ইসলাম, বিচক্ষণ ব্যক্তির নিদর্শনস্বরূপ ছিলেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা ১৬/৪৪৯)
এই জলীলুল কদর ইমামের বিরুদ্ধে পরবর্তী হানাফী ফকীহ মাহমূদ বিন আহমাদ আল-আইনীর (মৃ. ৮৫৫ হি.) সমালোচনামূলক উক্তিটি প্রত্যাখ্যাত।
আব্দুল হাঈ লাখনোবী এই আইনী সম্পর্কে লিখেছেন, ولو لم يكن فيه رائحة التعصب المذهبي لكان اجود واجود ‘যদি তার মাঝে মাযহাবী গোঁড়ামী না থাকত তবে খুবই ভাল হত’। (আল-ফাওয়ায়েদুল বাহিইয়া পৃ. ২০৮)
সতর্কীকরণ : ইমাম দারাকুতনী রহিমাহুল্লাহ তাদলীসের অপবাদ হতে মুক্ত। (দেখুন : আমার গ্রন্থ ‘আল-ফাৎহুল মুবীন ফী তাহক্বীক্বি ত্বাবাক্বাতিল মুদাল্লিসীন’ (১/১৯))
যখন হাদীসটি স্বয়ং হাদীছের মর্ম নির্দিষ্ট করে দিয়েছে এবং মুহাদ্দিসীনে কেরামও এই হাদীসটি দ্বারা নারীর নারীদের ইমামতি করাই অনুধাবন করছেন, তখন অভিধানের সহায়তায় ও শব্দের হেরফেরের কারণে নারীদেরকে পুরুষদের ইমাম বানিয়ে দেয়া কোন আদালতের ইনছাফ?
ইবনে কুদামা বলেছেন, وَهَذِهِ زِيَادَةٌ يَجِبُ قَبُولُهَا ‘এটা অতিরিক্ত। এটি গ্রহণ করা ওয়াজিব’। (আল-মুগনী ২/১৬)
এখানে এটাও মনে রাখতে হবে যে, সালাফে সালেহীনদের আসার থেকে ¯্রফে নারীর নারীদের ইমামতি করাই প্রমাণ হয়। নারীর পুরুষদের ইমামতি করা কোন আসার দ্বারা প্রমাণিত নেই।
রায়তাহ আল-হানাফিইয়া (ইজলী বলেছেন, তিনি কুফা বাসিনী, তাবেঈয়া, নির্ভরযোগ্যা) থেকে বর্ণিত আছে, أَمَّتْنَا عَائِشَةُ فَقَامَتْ بَيْنَهُنَّ فِي الصَّلَاةِ الْمَكْتُوبَةِ ‘আয়েশা আমাদের ইমামতি করেছেন। তিনি ফরয সালাতসমূহে তাদের (নারী নামাযীদের) মাঝখানে (প্রথম কাতারে) দাঁড়াতেন। (সুনানে দারাকুতনী হা/১৪২৯, ১/৪০৪, এর সনদ হাসান; নীমাবী হানাফী বলেছেন, এর সনদ ছহীহ, আছারুস সুনান হা/৫১৪; এবং দেখুন : আমার গ্রন্থ ‘আনওয়ারুস সুনান ফী তাহক্বীক্বি আছারিস সুনান’ পৃ. ১০৩)
ইমাম শাবী (প্রসিদ্ধ তাবেঈ) রহিমাহুল্লাহ বলেছেন,تَؤُمُّ الْمَرْأَةُ النِّسَاءَ فِي صَلَاةِ رَمَضَانَ تَقُومُ مَعَهُنَّ فِي صَفِّهِنَّ সালাতে নারীরা নারীদের ইমামতি করবে রমযানের। সে তাদের সাথে তাদের কাতারের মাঝখানে দাঁড়াবে। (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/৪৯৫৫, ২/৮৯, সনদ ছহীহ, হুছাইন হতে হুশাইমের ‘মুআনআন’ বর্ণনা ‘সামা’র উপর গণ্য হয়। দেখুন : ইবনে রজব, শারহু ইলালিত তিরমিযী ২/৫৬২; যুবায়ের আলী যাঈ, আল-ফাতহুল মুবীন ফী তাহক্বীক্বি ত্বাবাক্বাতিল মুদাল্লিসীন ১১১/৩)
ইবনে জুরাইজ বলেছেন, تَؤُمُّ الْمَرْأَةُ النِّسَاءَ مِنْ غَيْرِ أَنْ تَخْرُجَ أَمَامَهُنَّ، وَلَكِنْ تُحَاذِي بِهِنَّ فِي الْمَكْتُوبَةِ، وَالتَّطَوُّعِ ‘নারী যখন নারীদের ইমামতি করবে তখন সে সামনে দাঁড়াবে না। বরং তাদের বরাবর দাঁড়িয়েই ফরয ও নফল সালাতসমূহ পড়াবে। (মুছান্নাফ আব্দুর রায্যাক্ব হা/৫০৮০, ৩/১৪০, এই রেওয়ায়াতটির সনদ আব্দুর রায্যাক্বের তাদলীসের কারণে যঈফ)
মামার বিন রশীদ বলেছেন, تَؤُمُّ الْمَرْأَةُ النِّسَاءَ فِي رَمَضَانَ وَتَقُومُ مَعَهُنَّ فِي الصَّفّ ‘নারী নারীদের ইমামতি করবে রমযান মাসে। সে কাতারের মধ্যে তাদের সাথে (মাঝ বরাবর) দাঁড়াবে। (মুছান্নাফ আব্দুর রায্যাক্ব হা/৫০৮৫, ৩/১৪০, এই রেওয়ায়াতটির সনদ আব্দুর রায্যাক্বের তাদলীসের কারণে যঈফ)
এর উপর সালাফে সালেহীনদের ইজমা আছে যে, নারী যখন নারীদেরকে সালাত পড়াবে তখন কাতারের সামনে নয়, বরং কাতারের মধ্যেই তাদের সাথেই (মাঝ) বরাবর দাঁড়িয়ে সালাত পড়াবে।
আমি এমন একটি উদ্ধৃতিও সনদ সহকারে পাই নি যদ্বারা এটি প্রমাণিত হয় যে, সালাফে সালেহীনদের স্বর্ণালী যুগে কোন নারী পুরুষদের সালাত পড়িয়েছেন। বা কোন নির্ভরযোগ্য আলেম এর বৈধতার প্রবক্তা ছিলেন। (একইভাবে কোন রেওয়ায়াতে উম্মে ওয়ারাক্বা (রা.)-এর মুওয়াযযিনের তাঁর পিছে ছলাত পড়ারও আদৌ কোন প্রমাণ নেই)
ইবনে রুশদ (মৃ. ৫১৫ হি.) ও অন্যান্য কতিপয় পরবর্তী বিদ্বানগণ কোন সনদ এবং প্রমাণ ব্যতিরেকে লিখেছেন যে, ‘আবূ সাওর (ইবাহীম বিন খালেদ, মৃ. ২৪০ হি.) এবং (মুহাম্মাদ বিন জারীর) আত-তাবারী (মৃ. ৩১০ হি.) এ বিষয়টির প্রবক্তা যে, নারী পুরুষদের সালাত পড়াতে পারবেন’। (দেখুন : বিদায়াতুল মুজতাহিদ ১/১৪৫; আল-মুগনী ফী ফিক্বহিল ইমামি আহমাদ ২/১৫, মাসআলা-১১৪০)
যেহেতু এই উদ্ধৃতিগুলি সনদবিহীন সেহেতু (এগুলি) প্রত্যাখ্যাত।
তাহকীকের সারাংশ : নারীর সালাতে নারীদের ইমামতি করা জায়েয। কিন্তু তিনি পুরুষদের ইমাম হতে পারবেন না। (আল-হাদীছ- ১৫; ফাতাওয়া ইলমিইয়া ১/২৮৭)
(২) আল্লামা শামসুল হক আযীমাবাদী রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘এ হাদীস হতে প্রমাণিত হয়েছে, নিশ্চয়ই নারীর (অন্য নারীদের) ইমাম হওয়া এবং তাদের জামাআত করার বিষয়টি বিশুদ্ধ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ দ্বারা প্রমাণিত। আর নিশ্চয়ই আয়েশা (রা.) ও উম্মে সালামাহ (রা.) ফরয ও তারাবীর সালাতে নারীদের ইমামতি করেছিলেন’। (আওনুল মাবূদ হা/৫৯২ এর ব্যাখ্যা দ্র.)
(৩) আল্লামা আলবানী রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে ওয়ারাকাহ (রা.)-কে হুকুম দিতেন যে, তিনি যেন তার বাড়ির অধিবাসীদেরকে (স্বীয় এলাকা বা গোত্রের নারীদেরকে) সালাত পড়ান’ (হাদীসটি) হাসান। একে আবূ দাঊদ (হা/৫৯২), ইবনুল জারূদ ‘আল-মুনতাকা’ গ্রন্থে (হা/১৬৯), দারাকুতনী (হা/১৫৪, ১৫৫), হাকেম (১/২০৩), বায়হাকী (৩/১৩০), আহমাদ (৬/৪০৫), আবুল কাসেম আল-হামেয ‘আল-মুনতাকা মিন হাদীসিহ’ গ্রন্থে (৩/৯/২), আবূ আলী আস-সওয়াফ ‘হাদীসুহ’ (৮৯, ৯১) গ্রন্থে আল-ওয়ালীদ বিন জুমাই-এর সূত্রে (বর্ণনা করেছেন)।
তিনি বলেছেন, আমাকে হাদীস বর্ণনা করেছেন আমার দাদী এবং আব্দুর রহমান ইবনু খাল্লাদ আনসারী উম্মে ওয়ারাকা বিনতে আব্দুল্লাহ ইবনুল হারেস আনসারী হতে। তিনি কুরআনকে সংকলন করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে তাঁর বাড়ির অধিবাসীদেরকে ইমামতি করার জন্য আদেশ করতেন। আর তার জন্য একজন মুওয়াযযিন ছিল। তিনি (উম্মে ওয়ারাকা) তার বাড়ির অধিবাসীদের ইমামতি করতেন। শব্দগুলি আহমাদের।
আমি (আলবানী) বলছি : এই সনদটি হাসান। আল-ওয়ালীদ বিন জুমাই-এর মাধ্যমে মুসলিম দলীল পেশ করেছেন। যেমনটি হাকেম বলেছেন এবং যাহাবী তাঁর সাথে একমত হয়েছেন। তার দাদীর নাম লায়লা বিনতে মালেক। যেমনটি হাকেমের বর্ণনায় আছে। তাকে চেনা যায় না, যেমনটি হাফেয (ইবনে হাজার) ‘আত-তাকরীব’ গ্রন্থে বলেছেন।
পক্ষান্তরে আব্দুর রহমান বিন খাল্লাদ ‘মাজহূলুল হাল’। ইবনে হিব্বান তাকে ‘আস-সিকাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন স্বীয় নিয়মানুসারে! কিন্তু সেটি লায়লার সাথে (সনদের মধ্যে) সংযুক্ত রয়েছে। ফলে একটি রেওয়ায়াত অপর রেওয়ায়াতটিকে শক্তিশালী করছে। বিশেষত, যাহাবী ‘ফাসলুন নিসওয়াতিল মাজহুলাত’ (অজ্ঞাত নারী রাবীগণ) গ্রন্থে বলেছেন, নারীদের মধ্য হতে কেউ তাকে মিথ্যার অপবাদ দিয়েছেন এবং তাকে বর্জন করেছেন মর্মে আমি অবগত হই নি।
সম্ভবত এ জন্যই হাফেয ইবনে হাজার ‘বুলূগুল মারাম’ গ্রন্থে ইবনে খুযায়মাহ’র হাদীসটির তাসহীহ্কে সমর্থন করেছেন। তদুপরি তিনি ‘আত-তালখীস’ গ্রন্থে (পৃ. ১২১) স্বীয় ‘এবং এর সনদে আব্দুর রহমান বিন খাল্লাদ রয়েছেন। যার মাঝে জাহালাত রয়েছে’ উক্তিটি দ্বারা দোষারোপ করেছেন।
তিনি স্বয়ং লায়লার মুতাবাআত বা সমর্থনসূচক বর্ণনাটি হতে অমনোযোগী হয়ে গিয়েছিলেন। নতুবা তিনি অবশ্যই তাকে উল্লেখ করতেন এবং তার অবস্থা (জীবনী) বর্ণনা করতেন। যেমনটি তিনি করেছেন তার অনুসৃত ইবনে খাল্লাদ সম্পর্কে। মনে হয় যেন তিনি আবূ দাঊদের রেওয়ায়াতটির উপর নির্ভর করেছেন। কেননা সেখানে (আবূ দাঊদের রেওয়ায়াতের মধ্যে) তার (লায়লার) উল্লেখ নেই। আর দারাকুতনী ও আহমাদ তাদের বর্ণনার মধ্যে এর উল্টো করেছেন। উভয়ই ইবনে খাল্লাদকে (বর্ণনা করা) ব্যতীত তাকে (লায়লাকে) উল্লেখ করেছেন।
আর হাদীসটিকে মুনযিরী ত্রæটিযুক্ত বলেছেন আল-ওয়ালীদ বিন আব্দুল্লাহ্র কারণে। আমি এর প্রতি উত্তর দিয়েছি ‘সহীহ আবী দাঊদ’ গ্রন্থে। (হা/৬০৫) যার সারাংশ হল, তার দ্বারা (ইমাম) মুসলিম দলীল পেশ করেছেন। যেমনটি অতিবাহিত হয়েছে। আর নিশ্চয়ই একটি জামাআত তাকে সিকাহ বলেছেন। যেমন ইবনে মাঈন ও অন্যরা।
‘আত-তালীকুল মুগনী’-এর গ্রন্থকার ‘আল্লামা আইনী’ হতে বর্ণনা করেছেন যে, নিশ্চয়ই তিনি বলেছেন, حديث صحيح হাদীসটি সহীহ।
তবে সঠিক হল হাদীসটি হাসান। আল্লাহ্ই ভাল জানের। (ইরওয়াউল গালীল হা/৪৯৩)
হাদীসটি ইমাম আবূ দাঊদ রহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করে চুপ থেকেছেন। আর মুকাল্লিদ আব্দুল মালেক সাহেব বলেছেন, ‘যে হাদীসটি ইমাম আবূ দাঊদ বর্ণনা করে চুপ থাকেন সেটি তার নিকটে সালেহ বা কবুলযোগ্য’। (নবীজীর নামায পৃ. ৩৭৭, আরবী ইবারত দ্র.)
যাফর আহমাদ থানবী দেওবন্দীও এই মূলনীতির অনুসারী। (দেখুন : শায়খ যুবায়ের আলী যাঈ, ছলাতে হাত বাঁধার বিধান এবং স্থান পৃ. ৩২, প্রকাশক : হাফেয রায়হান কবীর বিন আব্দুর রহমান, পরিবেশনায় : তাওহীদ পাবলিকেশন্স)
(৪) শায়েখ বিন বায রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, نعم لا بأس بذلك، وقد روي عن عائشة وأم سلمة وابن عباس رضي الله عنهم ما يدل على ذلك، وإمامة النساء تقف وسطهن وتجهر بالقراءة في الصلاة الجهرية হ্যাঁ। এতে কোন অসুবিধা নেই (অর্থাৎ সালাতে নারীদের নারীকে ইমাম রূপে গ্রহণ করায় কোন সমস্যা নেই)। আয়েশা, উম্মে সালামাহ এবং ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত হয়েছে যা এর পক্ষে নির্দেশনা প্রদান করে। আর নারীদের ইমাম তাদের (প্রথম কাতারের) মাঝ বরাবর দাঁড়াবেন। আর তিনি জেহরী সালাতে উচ্চস্বরে কিরাআত পাঠ করবেন। (বিন বায, মাজমূ ফাতাওয়া ১২/১৩০)
(৫) শায়েখ উসায়মীন রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, নারীদের জামাআত সহকারে সালাত পড়া জায়েয। কিন্তু এটি কি তাদের ক্ষেত্রে সুন্নাত নাকি মুবাহ? কতিপয় আলেম বলেন, এটি সুন্নাত। পক্ষান্তরে কতিপয় আলেম বলেন, এটি মুবাহ। আর (হকের) সর্বাধিক নিকটবর্তী (মত) হল, এটি মুবাহ। কেননা সুন্নাত হওয়ার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে নেই। যদি তারা জামাআত সহকারে সালাত কায়েম করে তবে কোন অসুবিধা নেই। (মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল ১৫/১৪৭)
(৬) শায়েখ মুবাশ্বির আহমাদ রব্বানী হাফিযাহুল্লাহ বলেছেন, ‘এক নারী অন্যান্য নারীদের ইমামতি করতে পারবেন।…… তবে আমার জানা মতে, নারী নারীদের ঈদের সালাত ও জুমআর সালাত পড়িয়েছেন মর্মে কোন উদাহরণ সালাফদের থেকে নেই। তাই এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনারও কোন সুযোগ নেই। (আহকাম ওয়া মাসায়েল পৃ. ২২১-২২২, সংক্ষেপিত)
উপরোল্লিখিত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হল যে, একজন নারী অন্যান্য নারীদের ইমাম হতে পারবেন। সুতরাং ‘কোন মহিলা ইমাম হতে পারবে না’-দাবীটি সঠিক নয়।
তিনি লিখেছেন-৬ : ‘অথচ মহিলাকে মসজিদ ও জামাআতের পরিবর্তে ঘরের ভেতরে নামায পড়ার হুকুম করা হয়েছে’। (পৃ. ৩৭৬)
পর্যালোচনা : মহিলাদের জন্য মসজিদে যাওয়া জরূরী নয়। তবে তাদেরকে বাঁধা দেওয়াও হারাম। তারা চাইলে যেতে পারেন। জুমআর খুতবায় তাদের অংশগ্রহণ করা ভাল। কেননা এতে করে তারা ইসলাম সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারবেন। ‘জুমআর খুতবা ও সালাত’ সম্পর্কে পৃথক গ্রন্থে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। দ্বিতীয় অধ্যায়ে মহিলাদের মসজিদে গিয়ে জামাআতে অংশ গ্রহণের স্বপক্ষে কতিপয় হাদীস উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি লিখেছেন-৭ : ‘নামাযে সতর্ক করার মত কোন ঘটনা ঘটলে সতর্ক করার জন্য কিংবা অবহিত করার জন্য পুরুষকে তাসবীহ পড়ার হুকুম করা হয়েছে; অথচ মহিলাদের জন্য হুকুম হল ‘তাসফীক’ করা তথা হাতে শব্দ করে অবহিত করা। (নবীজীর নামায পৃ. ৩৭৬)
পর্যালোচনা : এ বক্তব্য দ্বারা প্রতীয়মান হল যে, মহিলারা জামাআতে সালাত আদায় করতে পারবেন। নতুবা হাতে শব্দ করে ইমামকে অবহিত করার প্রসঙ্গ আসবে কেন?
তিনি লিখেছেন-৮ : ‘তদ্রপ নামায আদায়ের পদ্ধতির মধ্যেও মহিলাদের সতর ও পর্দার বিশেষ বিবেচনা করতে গিয়ে বেশ কিছু জায়গায় শরীয়ত মহিলাদের জন্য স্বতন্ত্র হুকুম নির্ধারণ করেছে’। (ঐ)
পর্যালোচনা : শরীয়ত নির্ধারণ করেছে মর্মে কোন বিশুদ্ধ দলীল আমরা অবগত নই। বরং হানাফী মাযহাবের অনুসারী (!) দাবীদাররা এটি নির্ধারণ করেছেন (ভূমিকা দ্র.)। তবে শরীয়ত নির্ধারণ করেছে মর্মে কোন গ্রহণযোগ্য হাদীস পেশ করা হয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ আমরা সেগুলি নিয়ে গবেষণা করে সঠিক মনে হল গ্রহণ করব।
এরপর তিনি দলীল হিসাবে চারটি উৎস উল্লেখ করেছেন।
১. হাদীস শরীফ। (ঐ)
২. সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-দের আসার বা বক্তব্য। (ঐ)
৩. তাবেঈ ইমামগণের ঐক্যমত। (ঐ)
৪. চার ইমামের ঐক্যমত। (ঐ)
প্রথমত : তিনি যে হাদীসগুলি পেশ করেছেন সেগুলি গ্রহণযোগ্য নয়। সামনে এর পর্যালোচনা আসছে।
দ্বিতীয়ত : তাঁর পেশকৃত সাহাবী ও তাবেঈনদের আসারসমূহ-কোনটাই বিশুদ্ধ নয়।
তৃতীয়ত : তিনি চার ইমামের নাম উল্লেখ করলেও নিজেদের মুকাল্লাদ ইমাম আবূ হানীফা রহিমাহুল্লাহ হতে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত কোন উক্তি উপস্থাপন করেন নি। এটি তিনি স্বেচ্ছায় করেছেন না কি অনিচ্ছায় করেছেন তা বোধগম্য নয়।
তিনি লিখেছেন-৯ : ‘মুকাল্লিদ যেহেতু ইজতিহাদের যোগ্যতার অধিকারী নয় তাই সে মুজতাহিদের গবেষণা ও সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখে’। (পৃ. ৮১)
পর্যালোচনা : মুকাল্লিদ আব্দুল মালেক সাহেব যে রেওয়ায়াতগুলি পেশ করেছেন সেগুলির সনদগত মান স্বীয় মুকাল্লাদ ইমাম ও মুজতাহিদ হতে পেশ করতে সক্ষম হননি। তার বর্ণনাকৃত হাদীস, আসারগুলি দ্বারাই যে ইমাম আবূ হানীফা রহিমাহুল্লাহ ‘নারী-পুরুষের সালাতের পার্থক্যসমূহ’ নিরূপণ করেছেন তাও তার লেখায় স্পষ্ট নয়। বাহ্যত মনে হল, তিনি মুকাল্লিদ হয়েও বিভিন্ন হাদীস দ্বারা স্বয়ং ইজতিহাদ (?) করে এই পার্থক্যগুলি নির্বাচন করেছেন।
তিনি লিখেছেন-১০ : ‘খোদ গায়রে মুকাল্লিদ আলেমরাও-যাদের কথিত অনুসারীরা এ পার্থক্যটিকে আজ মানতে চান না- মহিলাদের নামাযের পার্থক্যের এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েছেন। এবং এর ভিত্তিতেই তাদের ফতওয়া বিদ্যমান’। (নবীজীর নামায  পৃ. ৩৭৬)
পর্যালোচনা : এই বক্তব্য হতে প্রতীয়মান হয়।-
(১) তিনি স্বীকার করেছেন যে, গায়ের মুকাল্লিদরাও আলেম হয়। উল্লেখ্য, ইমাম আবূ হানীফাও গায়ের মুকাল্লিদ ছিলেন।
(২) ‘গায়ের মুকাল্লিদ’ এর আভিধানিক অর্থ হল।- গায়ের : অন্য, ভিন্ন, অপর, ব্যতীত।(ড. ফজলুর রহমান, আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান পৃ. ৭৪০; মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (৪র্থ সংস্করণ মে ১৯৯২ইং) পৃ. ৪৫৭) মুকাল্লিদ : অন্ধ অনুসরণকারী, জালকারী, নকলকারী ইত্যাদি।(ঐ পৃ. ৯৯৩) উভয়ের অর্থ দাঁড়ায়- যারা জাল করে না, নকল করে না।
অন্যদিকে মুকাল্লিদ অর্থ- যে জাল করে, নকল করে বা অন্ধ অনুসরণ করে। সুতরাং জাল কথা ছড়ায়, অন্যের কথা জাল করে তার অনুমতি ছাড়া, তারাই হল মুকাল্লিদ। আর যারা এর বিপরীত করেন তারা হলেন গায়ের মুকাল্লিদ (তাদের ভাষায়)। (তাক্বলীদের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ সম্পর্কে দলীল সহ সম্যক ধারণা লাভ করার জন্য দেখুন : শায়খ যুবায়ের আলী যাঈ (রহ.) রচিত ‘ইসলামে তাকলীদের বিধান’ গ্রন্থটি। এছাড়াও দুজন ছাহাবী ও একশত ইমামের তাকলীদ সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞামূলক ফতওয়া জানতে দেখুন শায়খের ‘আহলে হাদীছ একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম’ বইটি। গ্রন্থদ্বয়ের বঙ্গানুবাদ ‘হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ হতে প্রকাশিত হয়েছে। আল-হামদুলিল্লাহ।)
(৩) আল্লাহ একে অপরকে মন্দ নামে ডাকতে নিষেধ করেছেন। (হুজুরাত ৪৯/১১) এটি একটি মন্দ নাম। ‘গায়ের মুকাল্লিদ’ বলে সম্বোধন করে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ঈমানদার ব্যক্তির কাজ হতে পারে না। তদুপরি আমরা নিজেদেরকে এই নামে আদৌ পরিচয় দেই না। তাছাড়াও ইমাম আবূ হানীফা রহিমাহুল্লাহ কাউকে এই সব মন্দ নামে সম্বোধন করেন নি।
(৪) যিনি মানুষ তাকে আরবীতে বলা হয় ‘ইনসান’। এক্ষণে যে মানুষ নয় বরং অন্য কোন প্রাণী; তাকে বলতে পারেন ‘গায়ের ইনসান’ (মুকাল্লিদ ভাইদের বাক্যরীতি অনুসারে)। যেমন গরুকে আমরা ‘গায়ের ইনসান’ বলতে পারি। অথবা মানুষকে আমরা ‘গায়ের বাকারা’ (বাকারা মানে গরু, গাভী) বলতে পারি। বলাবাহুল্য, এ জাতীয় সম্বোধন রীতি কোন ভাষায় আছে বলে জানা নেই। তবে মুকাল্লিদ ভাইদের মুখে এই সম্বোধন রীতির ব্যাপক চর্চা রয়েছে। গরুকে যদি আমরা বাক্বারা না বলে ‘গায়ের ইনসান’ (মানুষ ভিন্ন অন্য কিছু) বলি তবে কি তা হাস্যকর হবে না? অথবা কোন মানুষকে যদি আমরা ‘গায়ের বাকারা’ (গরু ব্যতীত অন্য কিছু) বলি তবে কি সেটা অজ্ঞতার পরিচায়ক হয়ে যাবে না?
(৫) ‘গায়ের মুকাল্লিদ’ ও ‘আহলে হাদীস (সালাফী)’ এক নয়। গায়ের মুকাল্লিদ অর্থ যারা তাকলীদ করে না। একজন ‘মুনকিরীনে হাদীছ’ তথা হাদীস অস্বীকারকারী নিজেকে গায়ের মুকাল্লিদ দাবী করতে পারে। অর্থাৎ সে কোন মাযহাবকেই মানে না বলে দাবী করতে পারে। এরা হাদীসকে অস্বীকার করে এবং স্রেফ কুরআনুল কারীম মানার কথিত দাবীদার। (এদেরকে আমাদের দেশে না জেনে আমরা ‘আহলে কুরআন’ বলি। অথচ আহলে কুরআন দ্বারা উদ্দেশ্য হল- (ক) কুরআনের তথা ইসলামের প্রকৃত  অনুসারী। (খ) দক্ষ মুফাসসিরগণ যারা কুরআনের মর্ম এবং তাফসীর সম্পর্কে অগাধ ইলম রাখেন।)
‘গায়ের মুকাল্লিদ’ দ্বারা আহলে হাদীসদেরকে সম্বোধন করার উদ্ভট নীতি চার ইমামের কোন ইমাম থেকে প্রমাণিত নেই। এটি আমাদের মুকাল্লিদ ভাইদের অজ্ঞতার কারণে প্রচলিত হয়েছে। বস্তু আহলে হাদীস দ্বারা দু শ্রেণীর লোককে বুঝানো হয়। (১) মুজতাহিদ ইমামগণ যারা হাদীছের সনদ-মতনসহ হাদীসের বিষয়ে গভীর ইলম রাখেন। (২) সাধারণ মানুষ যারা হাদীসের উপর আমল করেন। তারা কোন পীর-বুযুর্গ, ইমাম সাহেবের অন্ধ তাকলীদ না করে কুরআন-হাদীসের উপর বুঝে শুনে আমল করার চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে দু জন বিখ্যাত মুজতাহিদ ইমামের উক্তি তুলে ধরা হল-
১. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, صَاحِبُ الْحَدِيثِ عِنْدَنَا مَنْ يَسْتَعْمِلُ الْحَدِيثَ ‘আমাদের নিকটে আহলে হাদীস ঐ ব্যক্তি যিনি হাদীসের উপরে আমল করেন’। (খতীব বাগদাদী, আল-জামে হা/১৮৩, যুবায়ের যাঈ এর সনদকে ছহীহ বলেছেন। দ্র. আহলে হাদীছ একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম পৃ. ১৪৫)
২. ইমাম ইবনে তায়মিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
وَنَحْنُ لَا نَعْنِي بِأَهْلِ الْحَدِيثِ الْمُقْتَصِرِينَ عَلَى سَمَاعِهِ أَوْ كِتَابَتِهِ أَوْ رِوَايَتِهِ بَلْ نَعْنِي بِهِمْ : كُلَّ مَنْ كَانَ أَحَقَّ بِحِفْظِهِ وَمَعْرِفَتِهِ وَفَهْمِهِ ظَاهِرًا وَبَاطِنًا وَاتِّبَاعِهِ بَاطِنًا وَظَاهِرًا وَكَذَلِكَ أَهْلُ الْقُرْآنِ
‘আমরা আহলে হাদীস বলতে কেবল তাদেরকেই বুঝি না যারা হাদীস শুনেছেন, লিপিবদ্ধ করেছেন বা বর্ণনা করেছেন। বরং আমরা আহলে হাদীস দ্বারা ঐ সকল ব্যক্তিকে বুঝিয়ে থাকি, যারা হাদীছ মুখস্থকরণ এবং গোপন ও প্রকাশ্যভাবে তার জ্ঞান লাভ ও অনুধাবন এবং অনুসরণ করার অধিক হকদার’।(মাজমূ ফাতাওয়া  ৪/৯৫)
হাফেয ইবনু তাইমিয়াহ’র উল্লেখিত উক্তি থেকেও আহলে হাদীস-এর (আল্লাহ তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করুন) দুটি শ্রেণী সাব্যস্ত হয়-
১. হাদীসের প্রতি আমলকারী মুহাদ্দিসীনে কেরাম।
২. হাদীসের উপরে আমলকারী সাধারণ জনগণ।
সুতরাং ঢালাও ভাবে গায়ের মুকাল্লিদ বলা উচিত নয়। আমাদেরকে লা-মাযহাবী বলাও ঠিক না। কারণ আমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাযহাবের (ইসলামের) অনুসারী। তাই আমাদের কোন মাযহাব নেই কথাটিও অজ্ঞতাপ্রসূত প্রলাপ মাত্র।
ভূমিকাস্বরূপ উপরোক্ত কথাগুলি বলা হল। এক্ষণে আমরা মূল আলোচনায় যাবো। আমাদের যে কোন ভুল শুধরিয়ে দেয়ার জন্য সাদর আমন্ত্রণ রইল।

প্রথম অধ্যায়

প্রথম পরিচ্ছেদ – মারফূ বর্ণনাসমূহ

মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব কতিপয় মারফূ বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যেগুলির অনুবাদ ও তাহকীক নিম্নরূপ-
দলীল-১ :
عَنْ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ فَقَالَ لِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا وَائِلُ بْنَ حُجْرٍ، إِذَا صَلَّيْتَ فَاجْعَلْ يَدَيْكَ حِذَاءَ أُذُنَيْكَ، وَالْمَرْأَةُ تَجْعَلُ يَدَيْهَا حِذَاءَ ثَدْيَيْهَا
ওয়ায়েল বিন হুজর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘হে ওয়ায়েল বিন হুজর! যখন তুমি সালাত পড়বে তখন তোমার দুহাত কান পর্যন্ত উত্তোলন করবে। আর নারীরা তাদের দুহাত বুক পর্যন্ত উত্তোলন করবে’। (তাবারানী, মুজামুল কাবীর হা/২৮, ১৯/২২)
জবাব : এই বর্ণনাটি যঈফ। নি¤েœাক্ত কারণে এটা দলীল ও আমলযোগ্য নয়।
(১) হাদীসের হাফেয নূরুদ্দীন হায়ছামী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ فِي حَدِيثٍ طَوِيلٍ فِي مَنَاقِبِ وَائِلٍ مِنْ طَرِيقِ مَيْمُونَةَ بِنْتِ حُجْرٍ، عَنْ عَمَّتِهَا أُمِّ يَحْيَى بِنْتِ عَبْدِ الْجَبَّارِ، وَلَمْ أَعْرِفْهَا، وَبَقِيَّةُ رِجَالِهِ ثِقَاتٌ এটি তাবারানী একটি দীর্ঘ হাদীসে ওয়ায়েল-এর মানাকিবে ‘মায়মূনাহ বিনতে হুজর’ সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি তার ফুপু উম্মে ইয়াহ্ইয়া বিনতে আব্দুল জাব্বার হতে বর্ণনা করেছেন। আর আমি তাকে (উম্মে ইয়াহ্ইয়াকে) চিনি না। এর অবশিষ্ট রাবীগণ আস্থাভাজন। (হায়সামী, মাজউমাউয যাওয়ায়েদ হা/২৫৯৪)
উল্লেখ্য, হায়সামীর এই উক্তিটি মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব সম্পাদিত ‘নবীজীর নামায’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হলেও এর বঙ্গানুবাদ করা হয়নি। (ড. ইলিয়াস ফয়সাল, সম্পাদনা : মাওলানা আব্দুল মালেক পৃ. ৩৭৯, পরিশিষ্ট-২)
(২) শায়েখ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহিমাহুল্লাহ বলেন, قلت: وهذا إسناد ضعيف؛ فإن ميمونة بنت حجر، وعمتها أم يحيى بنت عبد الجبار؛ لم أجد لهما ترجمة আমি বলেছি, এই সনদটি যঈফ। কেননা মায়মূনা বিনতে হুজর ও তার ফুপু উম্মে ইয়াহ্ইয়া বিনতে আব্দুল জাব্বার- উভয়ের জীবনী আমি পাইনি। (সিলসিলাহ যঈফা হা/৫৫০০)
অতঃপর তিনি বলেছেন, فالتفريق المذكور في الحديث منكر والله أعلم এই হাদীসে উপরোল্লিখিত পার্থক্যটি পরিত্যাক্ত। আল্লাহ্ই ভাল জানেন (ঐ)।
তবে আলবানীর এই ‘বক্তব্যটুকু নবীজীর’ নামায বইয়ে বলা হয়নি।
(৩) হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী রহিমাহুল্লাহ বলেন, لَمْ يَرِدْ مَا يَدُلُّ عَلَى التَّفْرِقَةِ فِي الرَّفْعِ بَيْنَ الرَّجُلِ وَالْمَرْأَةِ এমন কিছু বর্ণিত হয়নি যা পুরুষ এবং নারীর রফউল ইদায়েনের বিষয়ে পার্থক্য নির্দেশ করে। (ফাতহুল বারী ২/২২১, হা/৭৩৮ দ্র.)
(৪) আল্লামা শাওকানী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, وَاعْلَمْ أَنَّ هَذِهِ السُّنَّةُ تَشْتَرِكُ فِيهَا الرِّجَالُ وَالنِّسَاءُ وَلَمْ يَرِد مَا يَدُلُّ عَلَى الْفَرْقِ بَيْنَهُمَا فِيهَا، وَكَذَا لَمْ يَرِدْ مَا يَدُلُّ عَلَى الْفَرْقِ بَيْنَ الرَّجُلِ وَالْمَرْأَةِ فِي مِقْدَارِ الرَّفْعِ আর জেনে রাখো! নিশ্চয়ই এই সুন্নাতটি পুরুষ-নারী উভয়কে (আমলের ক্ষেত্রে সমানভাবে) অন্তর্ভুক্ত করে। আর এমন কিছু বর্ণিত হয়নি যা এই বিষয়ে উভয়ের মাঝে কোন পার্থক্য নির্দেশ করে। তদ্রæপ এমন কিছুই বর্ণিত হয়নি যা হাত উত্তোলন করার পরিমাণ সম্পর্কে পুরুষ এবং নারীর মাঝে পার্থক্য নির্দেশ করে। (নায়লুল আওতার হা/৬৭১, ২/২১৪)
সুতরাং উক্ত বর্ণনাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি সম্বন্ধযুক্ত করা যাবে না। কেননা এটি দুর্বল বর্ণনা। উল্লেখ্য যে, ড. ইলিয়াস ফয়সাল প্রণিত ‘নবীজির নামায’ গ্রন্থে এই বর্ণনাটিকে উল্লেখ করা হয়েছে। যা গ্রহণযোগ্য নয় (নবীজীর নামায, পরিশিষ্ট-২ পৃঃ ৩৭৮, ৩৭৯)।
দলীল-২ : আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, التَّسْبِيحُ لِلرِّجَالِ، وَالتَّصْفِيقُ لِلنِّسَاءِ ‘তাসবীহ হল পুরুষদের জন্য ও তাছফীক্ব হল নারীদের জন্য’ (বুখারী হা/ ১২০৩)।
(এক হাতের পাতা দ্বারা অন্য হাতের তালুতে মারাকে তাছফীক্ব বলা হয়)।
জবাব : এই হাদীছ দ্বারা নারীদের জামাআতের সাথে ছলাত পড়া জায়েয প্রমাণিত হয়। কিন্তু হানাফীগণ এই অনুমতি দিতে প্রস্তুত নন। এই পার্থক্য ছলাত আদায়ের পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত নয়। বরং ইমামের ভুলের জন্য সতর্কীকরণের সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং এই ছহীহ হাদীছটি তাক্বলীদপন্থীদের পক্ষে দলীল হতে পারে না।
দলীল-৩ : عَنْ عَائِشَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: لَا يَقْبَلُ اللَّهُ صَلَاةَ حَائِضٍ إِلَّا بِخِمَارٍ আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। বলেছেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘প্রাপ্ত বয়স্কার ছালাত আল্লাহ কবুল করেন না উড়না পরিধান ব্যতীত’ (ইবনে মাজাহ হা/৬৫৫)।
জবাব : এই হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, পুরুষের ওড়না বা এই জাতীয় (রুমাল, কাপড় ইত্যাদি) ব্যতিরেকেই উদোম মাথায় ছলাত আদায় করা বৈধ। এই শর্তটি মূলত ছলাতের শর্তের সাথে সম্পর্কিত যা মহিলাদের পর্দার কারণে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। এটা ছলাতের আভ্যন্তরিন পদ্ধতির সাথে শর্তযুক্ত নয়।
জ্ঞাতব্য : খালি মাথায় ছলাত আদায় করা জায়েয। তবে এটি অনুত্তম।
দলীল-৪ : عَنْ يَزِيدَ بْنِ أَبِي حَبِيبٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ عَلَى امْرَأَتَيْنِ تُصَلِّيَانِ فَقَالَ: إِذَا سَجَدْتُمَا فَضُمَّا بَعْضَ اللَّحْمِ إِلَى الْأَرْضِ فَإِنَّ الْمَرْأَةَ لَيْسَتْ فِي ذَلِكَ كَالرَّجُلِ ‘ইয়াযীদ বিন হাবীব হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুজন মহিলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা ছলাত পড়ছিল। তিনি বললেন, ‘যখন তোমরা সিজদা করবে তখন শরীরের কিছু অংশ যমীনের সাথে মিলিয়ে দিবে। কারণ এ ক্ষেত্রে নারী পুরুষের মত নয়’ (মারাসীলু আবী দাঊদ হা/৮৭)।
তাহক্বীক্ব : বর্ণনাটি নি¤েœাক্ত কারণে আমলযোগ্য নয়। এই রেওয়ায়াতটি মুরসাল। আর মুরসাল রেওয়ায়াতসমূহ সাধারণত যঈফ হয়ে থাকে। এর সনদে ‘সালেম বিন গায়লান’ নামী রাবী আছেন যিনি বিতর্কিত (শায়খ দাঊদ আরশাদ, হাদীছ আওর আহলে তাক্বলীদ বা জওয়াবে হাদীছ আওর আহলেহাদীছ ২/৮০)।
(১) শায়খ আলবানী (রহঃ) এই মুরসাল বর্ণনাটিকে যঈফ বলেছেন। তিনি বলেন, فعلة الحديث الإرسال فقط والله أعلم  ‘অতঃপর হাদীছটির স্রেফ একটি ত্র“টি রয়েছে, (এতে) ‘ইরসাল’ রয়েছে (সিলসিলাহ যঈফা হা/২৬৫২)। অর্থাৎ হাদীছটি মুরসাল।
আলবানীর এই উক্তিটি ‘নবীজীর নামায’ গ্রন্থে পেশ করা হয়েছে। তবে অনুবাদ করা হয় নি (পরিশিষ্ট-২ পৃঃ ৩৭৭)।
(২) হাফেয ইবনে হাজার (রহঃ) বলেছেন, وَرَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ مِنْ طَرِيقَيْنِ مَوْصُولَيْنِ، لَكِنْ فِي كُلٍّ مِنْهُمَا مَتْرُوكٌ একে বায়হাক্বী দু’টি ‘মওছূল’ সূত্রে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু উভয়ের প্রত্যেকটিতে একজন ‘মাতরূক’ তথা প্রত্যাখ্যাত (রাবী) আছেন (আত-তালখীছুল হাবীর, হা/৩৬৪)।
(৩) আলাউদ্দীন আলী বিন হুস্সামুদ্দীন (রহঃ) একে মুরসাল বলেছেন (কানযুল উম্মাল হা/১৯৭, إذا سجدتما فضما بعض اللحم إلى الأرض، فإن المرأة ليست في ذلك كالرجل. عن يزيد بن أبي حبيب مرسلا”)।
(৪) হাফেয জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী (রহঃ) একে মুরসাল আখ্যায়িত করেছেন (আল-ফাৎহুল কাবীর হা/১১৩৫, إِذا سَجَدْتُما فَضُمَّا بَعْضَ اللَّحْمِ إِلَى الأَرْضِ فإِنَّ المَرْأةَ لَيْسَتْ فِي ذلِكَ كالرَّجُلِ) عَن يزِيد بن أبي حبيب مُرْسلا.)।
(৫) ইবনুত তুরকুমানী হানাফী বলেছেন, ظاهر كلامه انه ليس في هذا الحديث الا الانقطاع وسالم متروك তার কথায় স্পষ্ট যে, এই হাদীছের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ব্যতীত আর কোন (ত্র“টি) নেই এবং সালেম (বিন গায়লান) হলেন মাতরূক (আল-জাওহারুন নাক্বী ২/২২৩)।
মুরসাল রেওয়ায়াত কি গ্রহণযোগ্য :
(১) ইবনে হাজার আসক্বালানী বলেছেন, আমি অসংখ্য মুরসাল বর্ণনা অনুসন্ধান করেছি। তারপর সেগুলি গায়ের আদেল (ন্যায়-পরায়ণ নন) হতে পেয়েছি। বরং তাদের অধিকাংশকে তাদের উস্তাদসমূহের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তখন তারা তাদের সম্পর্কে সমালোচনামূলক বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। যেমন আবূ হানীফার উক্তি- আমি জাবেরুল জুফীর চাইতে বড় মিথ্যুক আর দেখিনি। তার হাদীছও বিদ্যমান আছে। এবং শাবীর উক্তি- হারেছ আওয়ার আমাকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি মহা মিথ্যুক ছিলেন। তদুপরি তার হাদীছ বিদ্যমান (আন-নুকাত ২/৫৫০)।
(২) ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেছেন, وَالْمُرْسَلُ مِنَ الرِّوَايَاتِ فِي أَصْلِ قَوْلِنَا، وَقَوْلِ أَهْلِ الْعِلْمِ بِالْأَخْبَارِ لَيْسَ بِحُجَّةٍ আমাদের মূল বক্তব্য ও আহলে ইলম এবং আখবারদের উক্তি হল, মুরসাল বর্ণনা দলীল নয় (মুক্বাদ্দামা মুসলিম ১/২৯)।
(৩) ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেছেন, والْحَدِيث إِذا كَانَ مُرْسلا فَإِنَّهُ لَا يَصح عِنْد أَكثر أهل الحَدِيث قد ضعفه غير وَاحِد مِنْهُم আর হাদীছ যখন মুরসাল হবে তখন তা (তার দ্বারা দলীল গ্রহণ করা বা পেশ করা) শুদ্ধ হবে না অধিকাংশ আহলুল হাদীছের মতে। নিশ্চয় মুরসাল বর্ণনাকে একাধিক মুহাদ্দিছ যঈফ বলেছেন (আল-ইলালুছ ছগীর পৃঃ ৭৫৩)।
(৪) وَرَدَّهُ جَمَاهِرُ النُّقَّادِ … لِلجَهْلِ بِالسَّاقِطِ في الإسْنَادِ জমহুর মুহাদ্দিছগণ (সমালোচক এবং মুহাক্কিক্বগণ) একে (মুরসাল বর্ণনাকে) বাতিল বলেছেন। সনদের মধ্যে রাবীর পতিত হওয়ার বিষয়টি অজ্ঞাত থাকার কারণে (ফাৎহুল মুগীছ, ক্রমিক ১২৩)।
অর্থাৎ মুরসাল বর্ণনাতে কোন্ রাবী বাদ পড়েছেন তা অজানা থাকার কারণে একে যঈফ হিসেবে গণ্য করা হয়।
(৫) হাফেয ইরাক্বী রহিমাহুল্লাহ (মৃঃ ৮০৬ হিঃ) বলেছেন, وما ذكرناه من سقوط إلاحتجاج بالمرسل والحكم بضعفه هو المذهب الذي استقر عليه آراء جماهير حفاظ الحديث ونقاد إلاثر মুরসাল বর্ণনা দ্বারা দলীল পেশ করার বিষয়টি বর্জিত হওয়া এবং তার যঈফ হওয়ার হুকুম সম্পর্কে আমরা উল্লেখ করেছি। এটিই সেই মাযহাব যার পক্ষে জমহুর হাদীছের হাফেয এবং হাদীছের সমালোচকগণ অভিমত দিয়েছেন (আত-তাক্বঈদু ওয়াল ঈযাহ শরহে মুক্বাদ্দামা ইবনে ছালাহ পৃঃ ৭৩)।
(৬) খত্বীব বাগদাদী রহিমাহুল্লাহ লিখেছেনوَعَلَى ذَلِكَ أَكْثَرُ الْأَئِمَّةِ مِنْ حُفَّاظِ الْحَدِيثِ وَنُقَّادِ الْأَثَرِ , আর এর পক্ষেই অধিকাংশ হাদীছের হাফেয এবং হাদীছের সমালোচকগণ রয়েছেন (আল-কিফায়াহ পৃঃ ৩৮৪)।
(৭) ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, ثُمَّ الْمُرْسَلُ حَدِيثٌ ضَعِيفٌ عِنْدَ جَمَاهِيرِ الْمُحَدِّثِينَ وَالشَّافِعِيِّ وَكَثِيرٍ مِنَ الْفُقَهَاءِ وَأَصْحَابِ الْأُصُولِ অতঃপর মুরসাল হাদীছ অধিকাংশ মুহাদ্দিছ, শাফেঈ, অধিকাংশ ফক্বীহ ও আছাহবুল উছূলদের নিকটে যঈফ (তাদরীবুর রাবী শরহে তাক্বরীবুন নববী ১/২২২)।
(৮) ইমাম আবূ দাঊদ রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, فَإِذا لم يكن مُسْند غير الْمَرَاسِيل وَلم يُوجد الْمسند فالمرسل يحْتَج بِهِ وَلَيْسَ هُوَ مثل الْمُتَّصِل فِي الْقُوَّة আর যখন মুরসাল ব্যতীত কোন মুসনাদ বর্ণনা থাকবে না, এবং কোন মুসনাদ পাওয়া না যায় তখন মুরসাল দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে। আর এটি মুত্তাছিল-এর ন্যায় শক্তিশালী নয় (রিসালাতু আবী দাঊদ ইলা আহলি মাক্কাহ পৃঃ ৩৫)।
‘দলিলসহ নামাযের মাসায়েল’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ইমাম আবূ দাঊদ বলেছেন, وَأما الْمَرَاسِيل فقد كَانَ يحْتَج بهَا الْعلمَاء فِيمَا مضى مثل سُفْيَان الثَّوْريّ وَمَالك بن أنس وَالْأَوْزَاعِيّ حَتَّى جَاءَ الشَّافِعِي فَتكلم فِيهَا অর্থাৎ মুরসাল হাদীছ দ্বারা প্রমাণ পেশ করতেন পূর্বেকার আলেমগণ, যেমন, সুফিয়ান ছাওরী, মালেক ও আওযায়ী। অবশেষে শাফেঈ এসে এতে আপত্তি করেছেন (পৃঃ ৪১৬)।
এখানে ইমাম আবূ দাঊদের বাকি উক্তিটুক্ ুতুলে ধরা হয় নি। তিনি বলেছেন, وَتَابعه على ذَلِك أَحْمد بن حَنْبَل وَغَيره رضوَان الله عَلَيْهِم এবং তাকে আহমাদ বিন হাম্বল এবং অন্যরা অনুসরণ করেছেন। রিযওয়ানুল্লাহি আলাইহিম (রিসালাতু আবী দাঊদ ইলা আহলি মাক্কাহ পৃঃ ৩৪)।
সর্বশেষ ইমাম আবূ দাউদ বলেছেন, فَإِذا لم يكن مُسْند غير الْمَرَاسِيل وَلم يُوجد الْمسند فالمرسل يحْتَج بِهِ وَلَيْسَ هُوَ مثل الْمُتَّصِل فِي الْقُوَّة আর যখন মুরসাল ব্যতিত কোন মুসনাদ বর্ণনা থাকবে না। এবং কোন মুসনাদ পাওয়া না যায় তখন মুরসাল দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে। আর এটি মুত্তাছিল-এর ন্যায় শক্তিশালী নয় (রিসালাতু আবী দাঊদ ইলা আহলি মাক্কাহ পৃঃ ৩৫)।
অর্থাৎ ইমাম আবূ দাঊদ শর্ত সাপেক্ষে মুরসাল বর্ণনা গ্রহণ করার কথা বলেছেন। নিঃশর্তভাবে মুরসাল রেওয়ায়াত গ্রহণ করার কথা বলেন নি। আর ছাহাবী (রাঃ)গণও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হাদীছ গ্রহণ করতেন। এমনকি এক ছাহাবী আরেক ছাহাবীর কথাকেও যাচাই বাছাই করে গ্রহণ করতেন।
সতর্কীকরণ : ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ মুরসাল বর্ণনাকে গ্রহণ করেছেন বলে কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।
তাক্বলীদপন্থীদের দাবী অনুসারে চার মাযহাবই সঠিক। সুতরাং যদি ইমাম শাফেঈ বা ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্য হতে কোন একজন ইমাম ‘মুরসাল রেওয়ায়াত’কে গ্রহণ করা বেঠিক মনে করেন তবে তা তাক্বলীদপন্থীদের নিকটে সঠিক অভিমত হিসেবে গণ্য হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত।
সারকথা, মুরসাল রেওয়ায়াত শর্তহীনভাবে দলীলযোগ্য নয়। কেননা এতে রাবী মাজহূল থেকে যান এবং এর সনদে রাবীর বিচ্ছিন্নতা রয়ে যায়। যদি ‘মুরসাল বর্ণনা’র পক্ষে গ্রহণযোগ্য শাহেদ (সাক্ষীমূলক বর্ণনা) বা মুতাবা‘আত (সমর্থসূচক বর্ণনা) বিদ্যমান থাকে তাহ’লে তা দলীলযোগ্য হতে পারে।
জ্ঞাতব্য : মুক্বাল্লিদ আব্দুল মালেক ছাহেব অত্র হাদীছের আলোচনায় লিখেছেন, ইমাম আবূ দাঊদ যে রেওয়াত সম্পর্কে চুপ থাকেন সেটি তার নিকটে ‘ছালেহ’ (ঐ, পৃঃ ৩৭৭, আরবী ইবারত দ্রঃ, অনুবাদবিহীন)।
ইমাম আবূ দাঊদ ছলাতের মধ্যে বুকে হাত বাঁধা সম্পর্কে একটি রেওয়ায়াত বর্ণনা করার পরে চুপ থেকেছেন (আবূ দাঊদ হা/৭৫৯)। মুক্বাল্লিদ আব্দুল মালেক ছাহেবের ভাষ্যনুসারে এটি আবূ দাঊদের নিকটে ‘ছালেহ’। যা গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। কেননা ছালেহ দ্বারা ছহীহ এবং হাসান হাদীছকে বুঝানো হয়।
ইমাম আবূ দাঊদের চুপ থাকা সম্পর্কে জানতে বিশ্ববিখ্যাত মুহাক্কিক্ব, শায়খদের উস্তাদ, আল্লামা ইরশাদুল হক্ব আছারী (হাঃ)-এর কালজয়ী গ্রন্থ ইলাউস সুনান ফিল মীযান গ্রন্থটি অধ্যয়ন করুন।
দলীল-৫ :
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِذَا جَلَسَتِ الْمَرْأَةُ فِي الصَّلَاةِ وَضَعَتْ فَخِذَهَا عَلَى فَخِذِهَا الْأُخْرَى، وَإِذَا سَجَدَتْ أَلْصَقَتْ بَطْنَهَا فِي فَخِذَيْهَا كَأَسْتَرِ مَا يَكُونُ لَهَا، وَإِنَّ اللهَ تَعَالَى يَنْظُرُ إِلَيْهَا وَيَقُولُ: يَا مَلَائِكَتِي أُشْهِدُكُمْ أَنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهَا
আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলু ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন নারী ছালাতে বসবে তখন তার এক উরু অপর উরুর উপর রাখবে। আর যখন সিজদা করবে তখন পেটকে উরুর সাথে মিলিয়ে দিবে, যা তার সতরের অধিক উপযোগী হয়। আর নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং বলেন, হে আমার ফেরেশতাগণ! আমি তোমাদেরকে সাক্ষী রাখছি যে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম (বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা হা/৩১৯৯)।
জবাব : এর সনদ খুবই দুর্বল। এতে একাধিক সমস্যা রয়েছে। যেমন এখানে আবূ মুত্বী‘ আল-বালখী নামক অত্যন্ত দুর্বল রাবী রয়েছেন। যার সম্পর্কে মুহাদ্দিছদের উক্তি তুলে ধরা হল।-
(১) ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) বলেছেন, قَالَ أَبُو أَحْمَدَ: أَبُو مُطِيعٍ بَيْنَ الضَّعْفِ فِي أَحَادِيثِهِ، وَعَامَّةُ مَا يَرْوِيهِ لَا يُتَابَعُ عَلَيْهِ قَالَ الشَّيْخُ رَحِمَهُ اللهُ: وَقَدْ ضَعَّفَهُ يَحْيَى بْنُ مَعِينٍ وَغَيْرُهُ আবূ আহমাদ বলেছেন, আবূ মুত্বীর হাদীছ যঈফের অন্তর্ভুক্ত। আর তার অধিকাংশ রেওয়ায়াতের মুতাবা‘আত (সমর্থনসূচক বর্ণনা) করা হয় না। শায়খ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আর ইয়াহ্ইয়া বিন মাঈন ও অন্যরা তাকে যঈফ বলেছেন (আস-সুনানুল কুবরা হা/৩২০০)।
(২) ইবনু সা‘দ বলেছেন, أبو مطيع البلخي
واسمه الحكم بن عبد الله. وكان على قضاء بلخ. وكان مرجئًا وقد لقي عبد الرحمن بن حرملة وغيره وهو ضعيف عندهم في الحديث وكان مكفوفا. আবূ মুত্বী আল-বালখী, তার নাম আল-হাকাম বিন আব্দুল্লাহ। তিনি ‘বালখ’-এর বিচার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। আর তিনি মুরজিয়া ছিলেন। তিনি আব্দুর রহমান বিন হারমালা এবং অন্যান্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি তাদের নিকটে হাদীছের (বর্ণনার) ক্ষেত্রে যঈফ। তিনি অন্ধ ছিলেন (ত্বাবাক্বাতুল কুবরা, রাবী নং ৩৬৪৮)।
(৩) হাফেয ইবনে হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, كَانَ من رُؤَسَاء المرجئة مِمَّن يبغض السّنَن ومنتحليها তিনি ঐ সকল শীর্ষস্থানীয় মুরজিয়াদের মধ্য হতে ছিলেন যারা সুন্নাসমূহকে এবং সুন্নাতপন্থীদেরকে ঘৃণা করতেন (আল-মাজরূহীন, রাবী নং ২৩৬)।
(৪) الحكم بن عبد الله أَبُو مُطِيع الْبَلْخِي
عَن ابْن جريج وَغَيره تَرَكُوهُ হাকাম বিন আব্দুল্লাহ আবূ মুত্বী‘ আল-বালখী ইবনে জুরায়জ ও অন্যদের থেকে বর্ণনা করেছেন। তারা (মুহাদ্দিছগণ) তাকে বর্জন করেছেন (আল-মুগনী ফিয-যু‘আফা, রাবী নং ১৬৫৮)।
(৫) ইমাম আহমাদের পুত্র ইমাম আব্দুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দেন যে, لا ينبغي أن يروى عنه حكوا عنه أنه كان يقول: الجنة والنار خلقتا، فستفنيان، وهذا كلام جهم، لا يروى عنه شيء তার থেকে বর্ণনা করা উচিৎ নয়। কেননা তিনি বলতেন, জান্নাত এবং জাহান্নাম সৃষ্টি করা হয়ে গেছে। এবং অচিরেই উভয়টিই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর এটি জাহমীদের বক্তব্য। তার থেকে কিছুই বর্ণনা করা যাবে না। (মাওসূআতু আক্বওয়ালিল ইমাম আহমাদ, রাবী নং ৫৯৬)।
(৬) ইবনুল জাওযী (রহঃ) যঈফ ও পরিত্যক্ত রাবীদের গ্রন্থে তাকে উল্লেখ করেছেন (আয-যু‘আফাউল মাতরূকীন, রাবী নং ৯৫৯)।
(৭) ইমাম নাসাঈ (রহঃ) তাকে যঈফ বলেছেন (আয-যু‘আফাউল মাতরূকীন, রাবী নং ৬৫৪)।
(৮) ইমাম দারাকুৎনী (রহঃ) দুর্বল ও প্রত্যাখ্যাত রাবীদের গ্রন্থে তাকে উল্লেখ করেছেন (আয-যু‘আফাউল মাতরূকীন, জীবনী নং ১৬০)।
(৯) জমহুর মুহাদ্দিছগণ তাকে যঈফ বলেছেন (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : লিসানুল মীযান, রাবী নং ১৩৬৯)।
(১০) ইমাম বাইহাক্বী (রহঃ) ইমাম আহমাদের বরাতে বলেছেন, وَأَبُو مُطِيعٍ الْحَكَمُ بْنُ عَبْدِ اللهِ الْبَلْخِيُّ ضَعِيفٌ আর আবূ মুত্বী‘ আল-হাকাম বিন বালখী হলেন যঈফ (শুআবুল ঈমান হা/ ৩৪৩৪)।
(১১) যাহাবী (রহঃ) তাকে أَبُو مطيعٍ البلخيُّ – أحدُ المتروكينَ ‘অন্যতম মাতরূক’ তথা পরিত্যক্ত রাবী- বাক্যটি মুহাদ্দিছদের বরাতে উল্লেখ করেছেন (তানক্বীহুত তাহক্বীক্ব, নং ২৯৯)।
তিনি আরো বলেছেন,
وكان يصيرا بالرأى علامة كبير الشأن، ولكنه واه في ضبط الاثر আর তিনি ‘রায়’-এর মধ্যে আল্লামা তথা অত্যধিক জ্ঞানী, তাৎপর্যপূর্ণ ছিলেন। কিন্তু ‘আছার’ তথা হাদীছ আয়ত্বকরণে খুবই দুর্বল ছিলেন (মীযানুল ই‘তিদাল, রাবী নং ২১৮১)।
(১২) হাফেয হায়ছামী (রহঃ) বলেছেন, رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ فِي الْكَبِيرِ وَالْأَوْسَطِ، وَفِيهِ الْحَكَمُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ أَبُو مُطِيعٍ، وَهُوَ مَتْرُوكٌ একে ত্বাবারানী ‘আল-কাবীর’ এবং ‘আল-আওসাত্ব’-এ বর্ণনা করেছেন। আর তাতে হাকাম বিন আব্দুল্লাহ আবূ মুত্বী‘ রয়েছেন। এবং তিনি মাতরূক তথা পরিত্যক্ত (মাজমউয যাওয়ায়েদ হা/১৩৪৪৭)।
(১৩) ইমাম উক্বায়লী (রহঃ) ইমাম আহমাদের لَا يَنْبَغِي أَنْ يُرْوَى عَنْهُ ‘তার থেকে বর্ণনা উচিৎ নয়’- উক্তিটি উল্লেখ করেছেন। এবং তিনি ইবনে মাঈনের দু’টি উক্তি দু’টি পৃথক সনদে বর্ণনা করেছেন। যেমন- ইয়াহ্ইয়া বিন মাঈন বলেছেন, لَيْسَ بِشَيْءٍ তিনি কিছুই নন (উক্বায়লী, আয-যু‘আফাউল কাবীর, রাবী নং ৩১২)। আরেকটি সনদে বর্ণিত আছে যে, ইবনে মাঈন তাকে যঈফ বলেছেন (ঐ)।
(১৪) ইবনুল ক্বায়সারানী (রহঃ) বলেছেন, وَالْحكم هَذَا هُوَ أَبُو مُطِيع ضَعِيف এবং এই হাকাম হ’লেন আবূ মুত্বী‘। যিনি যঈফ (যাখীরাতুল হুফ্ফায, রাবী নং ২৬৫)।
(১৫) ইমাম জাওযাক্বানী (রহঃ) বলেছেন, ‘هَذَا حَدِيثٌ مَوْضُوعٌ بَاطِلٌ لَا أَصْلَ لَهُ، وَهُوَ مِنْ مَوْضُوعَاتِ أَبِي مُطِيعٍ
الْبَلَخِيِّ، وَأَبُو مُطِيعٍ ذَا اسْمُهُ الْحَكَمُ بْنُ عَبْدِ اللُّهِ الْبُلْخِيُّ، كَانَ مِنْ رُؤَسَاءِ الْمُرْجِئَةِ مِمَّنْ يَضَعُ الْحَدِيثَ وَيَبْغَضُ السُّنَنَ. ’ এই হাদীছটি বানোয়াট, বাতিল। এর কোন ভিত্তি নেই। আর এটি আবূ মুত্বী’র অন্যতম জাল বর্ণনা। তিনি ঐ সকল শীর্ষস্থানীয় মুরজিয়াদের অন্তর্ভুক্ত যারা হাদীছ জাল করতেন এবং সুন্নাতসমূহকে ঘৃণা করতেন (আল-আবাত্বীলু ওয়াল মানাকীরু ওয়াছ ছিহাহ ওয়াল-মাশাহীরু ১/১৪৪, ১৪৫)।
(১৬) ‘তালখীছু কিতাবিল মাওযূআত’ গ্রন্থে লেখা হয়েছে যে, فِيهِ: أَبُو مُطِيع، مُتَّهم بِهِ এতে আবূ মুত্বী রয়েছেন। যিনি (হাদীছ জাল করার দোষে) অভিযুক্ত (হা/২৭)।
(১৭) ইবনে ইরাক্ব বলেছেন, الحكم بن عبد الله أَبُو مُطِيع الْبَلْخِي قَالَ أَبُو حَاتِم مرجئ كَذَّاب وَقَالَ الجوزقاني كَانَ يضع الحَدِيث আল-হাকাম বিন আব্দুল্লাহ আবূ মুত্বী‘ বালখী- আবূ হাতেম বলেছেন, তিনি মুরজিয়া, মিথ্যুক। এবং জাওযাক্বানী বলেছেন, তিনি হাদীছ বানাতেন (তানযীহুশ শারীআহ রাবী নং ৪৮)।
(১৮) ইবনু আদী (রহঃ) বলেছেন, وأَبُو مطيع بين الضعف فِي أحاديثه وعامة ما يرويه، لاَ يُتَابَعُ عَليه এবং আবূ মুত্বী‘ স্পষ্টভাবে তার হাদীছে যঈফ (প্রমাণিত) হয়েছেন। আর সাধারণত তিনি যা বর্ণনা করেন সেগুলি সমর্থন করা হয় না (আল-কামিল, রাবী নং ৩৯৯)।
(১৯) হাফেয যুবায়ের আলী যাঈ (রহঃ) এই রেওয়ায়াতটিকে বানোয়াট বলেছেন (তাহক্বীক্বী মাক্বালাত ১/২৩০)।
(২০) শায়খ দাঊদ আরশাদ বলেছেন, এই রেওয়ায়াতটি অত্যন্ত দুর্বল এবং বাতিল (হাদীছ আওর আহলে তাক্বলীদ বি-জওয়াবে হাদীছ আওর আহলেহাদীছ ২/৮০)।
বিঃ দ্রঃ ‘নবীজীর নামায’ গ্রন্থে একে ‘হাসান হাদীছ’ বলা হয়েছে যা প্রত্যাখ্যাত (পৃঃ ৩৭৮, পরিশিষ্টি-২)।
উল্লেখ্য, ‘নবীজীর নামায’ গ্রন্থে লেখা হয়েছে, ‘আর মূলত তাতেই ইবরাত (শিক্ষা) রয়েছে যেটি উক্বায়লী উল্লেখ করেছেন। আর তা হল তিনি হাদীছের মধ্যে ‘ছালেহ’ ছিলেন’ (নবীজীর নামায পৃঃ ৩৭৮, আরবী ইবারত দ্রঃ)।
মাওলানা আব্দুল মালেক ছাহেব গ্রন্থ হিসাবে ইবনে হাজার আসক্বালানীর ‘লিসানুল মীযান’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। নি¤েœ উক্ত গ্রন্থের প্রায় সম্পূর্ণ বক্তব্যটুকু পেশ করা হল।-
ইবনে হাজার (রহঃ) লিখেছেন, আল-হাকাম বিন আব্দুল্লাহ ইবনে মুসলিম আবূ মুত্বী‘ আল-বালখী আল-খুরাসানী, আল-ফক্বীহ, আবূ হানীফার ছাত্র। আল্লাহ তাকে রহম করুন।… এবং একটি জামাআত তার দ্বারা ফিক্বহ অর্জন করেছেন। আর তিনি রায়ের ব্যাপারে অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি আল্লামা বা অত্যধিক জ্ঞানী, উচু মর্যাদা সম্পন্ন ছিলেন। কিন্তু আছার বা হাদীছ হিফযে অত্যন্ত দুর্বল।
ইবনুল মুবারক তাকে সম্মান করতেন, তাকে শ্রদ্ধা করতেন তার ধার্মিকতা এবং ইলমের জন্য।
(১) ইবনে মাঈন বলেছেন, ليس بشيء তিনি কিছুই নন। আরেকবার বলেছেন, ضعيف তিনি যঈফ।
(২) বুখারী বলেছেন, ضعيف صاحب رأي তিনি যঈফ, আহলে রায়।
(৩) নাসাঈ বলেছেন, ضعيف তিনি যঈফ।
(৪) ইবনুল জাওযী ‘আয-যুআফা’ গ্রন্থে বলেছেন, يروي عن إبراهيم بن طهمان وأبي حنيفة ومالك قال أحمد لا ينبغي أن يروي عنه بشيء তিনি ইবরাহীম বিন ত্বহমান এবং আবূ হানীফা, মালেক হ’তে বর্ণনা করেছেন। আহমাদ বলেন, তার থেকে কোন কিছুই বর্ণনা উচিৎ নয়।
{ইমাম মালেকের ছাত্র হলেন ইবরাহীম বিন ত্বাহমান। ইমাম আবূ হানীফা ইবরাহীম বিন ত্বাহমানের নিকটে ইমাম মালেকের হাদীছসমূহ শ্রবণ করে লিখতেন। প্রতীয়মান হল যে, ইমাম আবূ হানীফা ইমাম মালেকের ছাত্রের ছাত্র ছিলেন। বিস্তারিত দেখুন : যুবায়ের আলী যাঈ, তাহক্বীক্ব মুওয়াত্বা মালেক পৃঃ ৫২।- লেখক}
(৫) আবূ দাঊদ বলেছেন, تركوا حديثه وكان جهميا তারা (মুহাদ্দিছগণ) তার হাদীছকে বর্জন করেছেন। এবং তিনি জাহমী ছিলেন।
(৬) ইবনে আদী বলেছেন, هو بين الضعف عامة ما يرويه لا يتابع عليه তিনি দুর্বল রাবী। তিনি সাধারণত যা বর্ণনা করেন তার সমর্থন করা হয় না।
(৭) ইবনে হিব্বান বলেছেন, তিনি মুরজিয়াদের ঐ সকল শীর্ষস্থানীয়দের অন্যতম ছিলেন যারা সুন্নাতসমূহকে ঘৃণা করতেন এবং সেগুলিকে ধ্বংস করতেন।
(৮) উক্বায়লী বলেছেন, حدثنا عبد الله ابن أحمد سألت أبي عن أبي مطيع البلخي فقال لا ينبغي أن يروى عنه حكوا عنه أنه يقول الجنة والنار خلقتا فستفنيان وهذا كلام جهم আহমাদের পুত্র আব্দুল্লাহ আমাদেরকে বলেছেন যে, আমি আমার পিতাকে আবূ মুত্বী‘ বালখী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তার থেকে কোন কিছু বর্ণনা করা যাবে না। তারা তার সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলতেন, জান্নাত এবং জাহান্নাম সৃষ্টি করা হয়ে গিয়েছে। অচিরেই এ দুটি ধ্বংস হবে। আর এটি হল জাহম (বিন ছফওয়ানের) বক্তব্য।
(৯) আবূ হাতেম আর-রাযী বলেছেন, كان مرجئا كذابا তিনি মুরজী, মহা মিথ্যুক।
(১১) ইবনে সা‘দ বলেছেন,
كان مرجئا وهو ضعيف عندهم في الحديث وكان مكفوفا তিনি মুরজী ছিলেন। তিনি তাদের নিকটে হাদীছের মধ্যে যঈফ। এবং তিনি বধির ছিলেন।
(১২) সাজী বলেছেন, ترك لرأيه واتهمه তার রায়ের কারণে তাকে বর্জন করা হয়েছে। এবং তাকে মিথ্যার দোষে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
(১৩) উক্বায়লী বলেছেন, كان مرجئا صالحا في الحديث إلا أن أهل السنة أمسكوا عن الرواية عنه তিনি মুরজী, হাদীছের মধ্যে ছালেহ ছিলেন। তবে আহলে সুন্নাতের আলেমগণ তার থেকে রেওয়ায়াত করা হ’তে বিরত থেকেছেন।
(১৪) জাওযাক্বানী বলেছেন, كان أبو مطيع من رؤساء المرجئة ممن يضع الحديث ويبغض السنن আবূ মুত্বী‘ মুরজিয়াদের নেতৃস্থানীয়দের মধ্য হতে ছিলেন। তাদের অন্তর্ভুক্ত যারা হাদীছ বানাতেন এবং সুন্নাতসমূহকে ঘৃণা করতেন।
(১৫) খলীলী ‘আল-ইরশাদ’ গ্রন্থে বলেছেন, كان على قضاء بلخ وكان الحفاظ من أهل العراق وبلخ لا يرضونه তিনি বালখ-এর ক্বাযী ছিলেন। এবং তিনি বালখ ও ইরাক্বের হাফেযগণ তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না।
(১৭) وقد جزم الذهبي بأنه وضع حديثا যাহাবী দৃড়ভাবে বলেছেন যে, তিনি হাদীছ জাল করতেন ইত্যাদি। (লিসানুল মীযান, রাবী নং ১৩৬৯)।
এতগুলি ইমামদের বক্তব্য বাদ দিয়ে উক্বায়লীর একটি সনদবিহীন কথাকে লুফে নেওয়ার কারণটি বোধগম্য নয়।
জ্ঞাতব্য : ‘নবীজীর নামায’ গ্রন্থে (পৃঃ ৩৭৮) আব্দুল মালেক ছাহেব যদিও বায়হাক্বীর হাদীছটি তুলে ধরেছেন, তথাপি তিনি ইমাম বায়হাক্বীর উক্তিসমূহ গোপন করেছেন। ইমাম বায়হাক্বী বলেছেন, أَخْبَرَنَا أَبُو سَعْدٍ الصُّوفِيُّ، أنبأ أَبُو أَحْمَدَ بْنُ عَدِيٍّ، ثنا عُبَيْدُ بْنُ مُحَمَّدٍ السَّرْخَسِيُّ، ثنا مُحَمَّدُ بْنُ الْقَاسِمِ الْبَلْخِيُّ، ثنا أَبُو مُطِيعٍ، ثنا عُمَرُ بْنُ ذَرٍّ، فَذَكَرَهُ قَالَ أَبُو أَحْمَدَ: أَبُو مُطِيعٍ بَيْنَ الضَّعْفِ فِي أَحَادِيثِهِ، وَعَامَّةُ مَا يَرْوِيهِ لَا يُتَابَعُ عَلَيْهِ قَالَ الشَّيْخُ رَحِمَهُ اللهُ: وَقَدْ ضَعَّفَهُ يَحْيَى بْنُ مَعِينٍ وَغَيْرُهُ، وَكَذَلِكَ عَطَاءُ بْنُ عَجْلَانَ ضَعِيفٌ وَرُوِي فِيهِ حَدِيثٌ مُنْقَطِعٌ وَهُوَ أَحْسَنُ مِنَ الْمَوْصُولَيْنِ قَبْلَهُ আবূ মুত্বী‘ তার হাদীছ বর্ণনায় যঈফ। তিনি সাধারণত যা বর্ণনা করেন সেগুলির সমর্থন করা হয় না। শায়খ (রহঃ) বলেছেন, তাকে ইয়াহইয়া বিন মাঈন এবং অন্যরা যঈফ বলেছেন… (আস-সুনানুল কুবরা, নং ৩২০০)।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – মাওকূফ তথা ছাহাবীদের প্রতি সম্বন্ধযুক্ত বর্ণনাসমূহ

দলীল-১ : عَنْ عَبْدِ رَبِّهِ بْنِ سُلَيْمَانَ بْنِ عُمَيْرٍ قَالَ: رَأَيْتُ أُمَّ الدَّرْدَاءِ تَرْفَعُ يَدَيْهَا فِي الصَّلَاةِ حَذْوَ مَنْكِبَيْهَ আব্দি রব্বিহ বিন সুলায়মান বিন উমায়ের হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি উম্মে দারদাকে দেখেছি, তিনি তার দু’ হাতকে ছালাতে কাঁধ পর্যন্ত তুলতেন (ইমাম বুখারী, জুযউ রফ‘ইল ইদায়েন হা/২৩)।
জবাব : এই রেওয়ায়াত দ্বারা পুরষ এবং নারীদের ছলাতের পদ্ধতিগত কোন পার্থক্য প্রমাণিত হয় না।
‘উম্মুদ দারদা (রাঃ) কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলতেন’। আর এর পক্ষে ছহীহ হাদীছ রয়েছে। যেমন-
সালেম বিন আব্দুল্লাহ স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلاَةَ، وَإِذَا كَبَّرَ لِلرُّكُوعِ، وَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ، رَفَعَهُمَا كَذَلِكَ أَيْضًا، নিশ্চয়ই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ছালাত শুরু করতেন তখন কাঁধ পর্যন্ত দু’হাত তুলতেন এবং যখন রুকূ‘ করতেন, রুকূ‘ হতে মাথা উঠাতেন তখনও তদ্রƒপ দু’হাত তুলতেন (বুখারী হা/৭৩৫)।
এখানে فِي الصَّلَاةِ (ছলাতের মধ্যে) দ্বারা উদ্দেশ্য হল তাকবীরে তাহরীমা, রুকূ‘র আগে ও পরের রফউল ইদায়েন। যেমনটি ইমাম বুখারী (রহঃ) ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, عَبْدُ رَبِّهِ بْنُ سُلَيْمَانَ بْنِ عُمَيْرٍ قَالَ رَأَيْتُ أُمَّ الدَّرْدَاءِ ” تَرْفَعُ يَدَيْهَا فِي الصَّلَاةِ حَذْوَ مَنْكِبَيْهَا حِينَ تَفْتَتِحُ الصَّلَاةَ , وَحِينَ تَرْكَعُ وَإِذَا قَالَ: سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَفَعَتْ يَدَيْهَا , وَقَالَتْ: رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ আব্দু রব্বিহ বিন সুলায়মান বিন নুমায়ের হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উম্মুদ দারদাকে দেখেছি যে, তিনি ছলাতের মধ্যে তার দু’হাত দু’ কাঁধ পর্যন্ত তুলতেন, যখন তিনি ছলাত শুরু করতেন এবং রুকূ‘ করতেন। আর যখন তিনি বলতেন, ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’ তখন তাঁর দু’হাত তুলতেন এবং বলতেন, ‘রব্বানা ওয়া-লাকাল হামদ’ (ইমাম বুখারী, জুযউ রফইল ইয়াদায়েন হা/২৪; শায়খ হাফেয যুবায়ের আলী যাঈ এই হাদীছের সনদকে হাসান বলেছেন, তাহক্বীক্বী মাক্বালাত ১/২৩৬)।
স্মর্তব্য যে, হাদীছ হাদীছকে ব্যাখ্যা করে থাকে।
‘কান’ পর্যন্ত রফউল ইদায়েনেরও ছহীহ হাদীছ আছে। যেমন- মালেক বিন হুয়ায়রিছ (রাঃ) বলেন, أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا كَبَّرَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِيَ بِهِمَا أُذُنَيْهِ، وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِيَ بِهِمَا أُذُنَيْهِ، وَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ فَقَالَ: سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ নিশ্চয়ই যখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকবীর বলতেন তখন দু’হাতকে কান পর্যন্ত উত্তোলন করতেন। আর যখন রুকূ‘ করতেন এবং রুকূ‘ থেকে মাথা তুলতেন তখনও কান পর্যন্ত হাত তুলতেন। অতঃপর তিনি বলতেন, ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’ (মুসলিম হা/৩৯১)।
পুরুষরাও ‘কাঁধ’ পর্যন্ত রফ‘উল ইদায়েন করতে পারেন। এর পক্ষে ছহীহ হাদীছ বিদ্যমান। যেমন عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: ” رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا قَامَ فِي الصَّلاَةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يَكُونَا حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ، وَكَانَ يَفْعَلُ ذَلِكَ حِينَ يُكَبِّرُ لِلرُّكُوعِ، وَيَفْعَلُ ذَلِكَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ، وَيَقُولُ: سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، وَلاَ يَفْعَلُ ذَلِكَ فِي السُّجُودِ ” আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) বলেছেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখেছি যে, তিনি যখন ছলাতে দাঁড়াতেন তখন কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলতেন (বুখারী হা/৭৩৬)।
অতএব, কান এবং কাঁধ পর্যন্ত হাত উত্তোলন তথা রফউল ইদায়েন করা উভয়টিই নারী ও পুরুষের জন্য প্রযোজ্য।
দলীল-২ : عن ابن عمر انه سئل كيف كان النساء يصلين علي عهد رسول الله صلي الله عليه و سلم ؟ قال كن يتربصن ثم امرن ان يحتفزن ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তাকে জিজ্ঞেস করা হল যে, রাসূলের যুগে মহিলারা কিভাবে ছলাত আদায় করতেন? তিনি বললেন, তারা ছলাতে চারজানু হয়ে বসতেন অতঃপর জড়সড় হয়ে আদায় করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয় (জামেউল মাসানীদ ১/৪০০)
জবাব : এই রেওয়ায়াত সম্পর্কে শায়খ যুবায়ের আলী যাঈ (রহঃ) একটি চমৎকার তাহক্বীক্ব পেশ করেছেন। যা এখানে অনুবাদ করে দেওয়া হল- ‘আবুল মুয়াইয়িদ মুহাম্মাদ বিন মাহমূদ আল-খাওয়ারিযমী (মৃঃ ৬৬৫ হিঃ/ অনির্ভরযোগ্য)-এর গ্রন্থ জামেউল মাসানীদ-এ এই রেওয়ায়াতের কতিপয় রাবীর পর্যালোচনা নি¤œরূপ-
(১) ইবরাহীম বিন মাহদীর নির্দিষ্টতা অজ্ঞাত রয়েছে। ‘তাক্বরীবুত তাহযীব’-এ এই নামের দুজন রাবী আছেন। তন্মধ্যে দ্বিতীয়জন সমালোচিত। হাফেয ইবনে হাজার বলেছেন, ‘তিনি বাছরী, মুহাদ্দিছগণ তাকে কাযযাব বলেছেন’ (আত-তাক্বরীব, রাবী নং ২৫৭)।
(২) ‘যির্র বিন নুজায়েহ’-এর জীবনী পাওয়া যায় নি।
(৩) আহমাদ বিন মুহাম্মাদ খালেদ-এর জীবনী পাওয়া যায় নি।
(৪) আলী বিন মুহাম্মাদ আল-বায্যায-এর জীবনী পাওয়া যায় না।
(৫) ক্বাযী ওমর ইবনুল হাসান বিন আলী আল-আশনানী হলেন বিতর্কিত রাবী। তার সম্পর্কে ইমাম দারাকুৎনী বলেছেন, ‘তিনি মিথ্যা বলতেন’ (দারাকুৎনী, সুওয়ালাতুল হাকেম, নং ২৫২ পৃঃ ১৬৪)।
হাসান বিন মুহাম্মাদ আল-খাল্লাল বলেছেন, ‘তিনি যঈফ, মুহাদ্দিছগণ তার সমালোচনা করেছেন’ (তারীখে বাগদাদ ১১/২৩৮)।
যাহাবীও তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছেন।
আবূ আলী আল-হারবী ও আবূ আলী আল-হাফেয তাকে ছিক্বাহ বলেছেন (তারীখে বাগদাদ ১১/২৩৮)।
ইবনুল জাওযী তার বিরুদ্ধে কঠিণ সমালোচনা করেছেন (আল-মাউযূআত ৩/২৮০)। বুরহানুদ্দীন হালাবী তাকে হাদীছ জালকারীদের মধ্যে উল্লেখ করেছেন এবং কোন প্রতিরোধ (তাকে বাঁচানোর চেষ্টা) করেন নি (দ্রঃ আল-কাশফুল হাছীছ আম্মান রুমিয়া বি-ওয়াযঈল হাদীছ পৃঃ ৩১১, ৩১২, নং ৫৪১)।
যঈফ, মুতাযিলী, গোমরাহ আবুল ক্বাসেম ত্বালহা বিন মুহাম্মাদ বিন জাফর আশ-শাহেদ তার প্রশংসা করেছেন। খত্বীব বাগদাদীও তার প্রশংসা করেছেন।
তাহক্বীক্বের সারাংশ : ক্বাযী আশনানী জমহুর বিদ্বানদের নিকটে যঈফ।
সতর্কীকরণ : ক্বাযী আশনানী পর্যন্ত সনদেও আপত্তি আছে।
(৬) অন্য সনদে আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন খালেদ আর-রাযী, যাকারিয়া বিন ইয়াহইয়া নিশাপুরী এবং ক্বাবীছাহ ত্বাবারী (নামী) অজ্ঞাত রাবী রয়েছেন। আর আবূ মুহাম্মাদ আল-বুখারী (আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন ইয়াকূব) মিথ্যুক রাবী (দ্রঃ আল-কাশফুল হাছীছ পৃঃ ২৪৮; বায়হাক্বী, কিতাবুল ক্বিরাআত পৃঃ ১৫৪; লিসানুল মীযান ৩/৩৪৮, ৩৪৯; নূরুল আইনাইন ফী ইছবাতি রফইল ইদায়েন পৃঃ ৪০, ৪১)।
প্রতীয়মান হল যে, ক্বারী চান ছাহেবের পেশকৃত এই রেওয়ায়াতটি মাওযূ‘ (বানোয়াট)। আর ইমাম আবূ হানীফা হতে এই রেওয়ায়াত প্রমাণিত-ই নেই (তাহক্বীক্বী মাক্বালাত ১/২৩০)।
সুতরাং এটা বানোয়াট বর্ণনা।
দলীল-৩ :
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو الْأَحْوَصِ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، عَنِ الْحَارِثِ، عَنْ عَلِيٍّ، قَالَ: إِذَا سَجَدَتِ الْمَرْأَةُ فَلْتَحْتَفِرْ وَلْتَضُمَّ فَخِذَيْهَا আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নারী সিজদা করবে তখন যেন জড়সড় হয়ে যায় ও দুই উরুকে মিলিয়ে রাখে (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৭৭৭)।
জবাব : এই বর্ণনার সনদে হারেছ আল-আওয়ার নামী রাবী রয়েছেন। তার সম্পর্কে হাফেয যায়লাঈ (রহঃ) বলেছেন, كَذَّبَهُ الشَّعْبِيُّ. وَابْنُ الْمَدِينِيِّ، وَضَعَّفَهُ الدَّارَقُطْنِيُّ তাকে শাবী ও ইবনুল মাদীনী মিথ্যুক বলেছেন। আর দারাকুৎনী তাকে যঈফ বলেছেন (নাছবুর রায়াহ ২/৩)। নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) হারেছকে যঈফ বলেছেন (আছলু ছিফাতি ছলাতিন নাবী ২/৬৭১)। ইবনু সাদ (রহঃ) বলেছেন, وكان له قول سوء. وهو ضعيف في روايته তার বাজে উক্তি রয়েছে। আর তিনি তার নিজের বর্ণনায় যঈফ (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা, রাবী নং ২০৮৩)। জমহুর মুহাদ্দিছগণ তার চরম সমালোচনা করেছেন। কতিপয় তাকে মিথ্যুক পর্যন্তও বলেছেন (ইবনু আবী হাতিম, আল-জারহু ওয়াত-তাদীল, রাবী নং ৩৬৩)। ‘আত-তারীখুল আওসাত্ব’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, قَالَ الشّعبِيّ حَدثنِي الْحَارِث وَكَانَ كذابا শাবী বলেছেন, আমাকে হারিছ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আর তিনি মহা মিথ্যুক ছিলেন (রাবী নং ৭০৬)। নাসাঈ (রহঃ) বলেছেন, حَارِث بن عبد الله الْأَعْوَر لَيْسَ بِالْقَوِيّ হারিছ বিন আব্দুল্লাহ শক্তিশালী নন (আয-যু‘আফাউল মাতরূকীন, নং ১১৪)। ইমাম দারাকুৎনী (রহঃ) তাকে যঈফ এবং পরিত্যাক্ত রাবীদের মধ্যে উল্লেখ করেছেন (আয-যুআফাউল মাতরূকীন, রাবী নং ১৫১)। ‘আল-মুগনী ফী যুআফাইর রিজাল’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, الْحَارِث بن عبد الله الاعور من كبار عُلَمَاء التَّابِعين
قَالَ ابْن الْمَدِينِيّ كَذَّاب وَقَالَ الدَّارَقُطْنِيّ ضَعِيف وَقَالَ النَّسَائِيّ لَيْسَ بِالْقَوِيّ وَقد كذبه الشّعبِيّ হারিছ বিন আব্দুল্লাহ তাবেঈনদের কিবারু উলামাদের মধ্য হতে ছিলেন। ইবনুল মাদীনী বলেছেন, তিনি মিথ্যুক। আর দারাকুৎনী তাকে যঈফ বলেছেন। নাসাঈ ‘শক্তিশালী নন’ বলেছেন। এছাড়াও শাবী তাকে মিথ্যুক বলেছেন (রাবী নং ১২৩৬)। হাফেয ইবনে হাজার (রহঃ) বলেছেন, كذبه الشعبي في رأيه ورمي بالرفض وفي حديثه ضعف وليس له عند النسائي سوى حديثين مات في خلافة ابن الزبير তার রায়ের ক্ষেত্রে শাবী তাকে কাযযাব বলেছেন। আর তিনি রাফেযী মতালম্বী হওয়ার দোষে অভিযুক্ত। তার হাদীছে দুর্বলতা আছে। নাসাঈর কাছে তার বর্ণিত দুটি হাদীছ রয়েছে। তিনি ইবনুয যুবায়ের-এর খেলাফতকালে মারা যান (তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ১০২৯)। ولغوه في التشيع তিনি চরমপন্থী শীআ ছিলেন (ত্বাবাক্বাত, রাবী নং ১৮)। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) বলেছেন, وَقَدْ تَكَلَّمَ بَعْضُهُمْ فِي الحَارِثِ الأَعْوَرِ কতিপয় (মুহাদ্দিছ) হারিছ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন (তিরমিযী হা/২৭৩৬)।
সুতরাং এমন চরম দুর্বল (কারো কারো মতে মিথ্যুক) রাবীর বর্ণনা দ্বারা দলীল দেয়া শুদ্ধ নয়।
উপরন্তু এ হাদীছের সনদে ‘আবূ ইসহাক্ব আস-সাবীঈ’ নামক আরেকজন মুদালি­স রাবী রয়েছেন। যেমন ‘আসমাউল মুদালি­সীন’ গ্রন্থে আছে যে, كثير التدليس ويعرف بالإمام তিনি অত্যধিক তাদলীসকারী। এবং ইমাম হিসাবে পরিচিত (রাবী নং ৪৫)। ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) তাঁকে স্বীয় ‘ত্বাবাক্বাতুল মুদালি­সীন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন (রাবী নং ৯১)। ‘যিকরুল মুদালি­সীন’ (রাবী নং ৯), ‘আল-মুদালি­সীন’ প্রভৃতি বইয়ে তাকে প্রসিদ্ধ মুদালি­স রাবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (রাবী নং ৪৭)। ইমাম বায়হাক্বী (রহঃ) বলেছেন, وَقَدْ رُوِيَ فِيهِ حَدِيثَانِ ضَعِيفَانِ لَا يُحْتَجُّ بِأَمْثَالِهِمَا ‘এতে দুটি যঈফ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। এরূপ হাদীছ দ্বারা দলীল পেশ করা যায় না’ (আস-সুনানুল কুবরা হা/৩১৭৯)। নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) তাঁকে মুদালি­স রাবী বলেছেন (সিলসিলাহ ছহীহা হা/১৭০১)। অন্যত্র তিনি বলেছেন, الثانية: أبو إسحاق السبيعي، ثقة ولكنه على اختلاطه مدلس দ্বিতীয়ত, আবূ ইসহাক্ব আস-সাবীঈ আস্থাভাজন। কিন্তু তিনি তার ইখতিলাত্ব থাকাসত্বেও মুদালি­স (ঐ, হা/২০৩৫)।
[রাবীর হিফয শক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া, বিবেক-বুদ্ধি দুর্বল হয়ে যাওয়া, হাদীছকে সঠিকভাবে মনে রাখতে না পারায় হাদীছের বাক্যে তালগোল পাকিয়ে যাওয়াকে ইখতিলাত্ব বলা হয়। বিভিন্ন কারণে ইখতিলাত্ব হতে পারে। যেমন বয়স বেড়ে যাওয়া, বই-পুস্তক জ্বলে যাওয়া, ধন-সম্পদের ক্ষতি হওয়া কিংবা সন্তান-সন্ততির মৃত্যু ঘটার কারণে মানসিক আঘাত পাওয়া ইত্যাদি (তায়সীরু মুছত্বলাহিল হাদীছ, পৃঃ ১২৫ প্রভৃতি)।-লেখক]
স্মর্তব্য যে, একজন রাবী নির্ভরযোগ্য হওয়ার সাথে সাথে মুদালি­সও হতে পারেন। যেমন সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) ইত্যাদি। অতএব এই রেওয়ায়াতটি জাল না হলেও অত্যন্ত দুর্বল। সাথে সাথে এটি ‘মুআনআন’ও যা যঈফ।
[তবে আস্থাভাজন রাবী ‘সামা’র বিষয়টি স্পষ্ট করলে উক্ত রাবীর মধ্যে কোন সমস্যা থাকে না। ‘আমি শ্রবণ করেছি’ ‘আমাকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন’ ‘আমাদেরকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন’ ‘আমাকে সংবাদ প্রদান করেছেন’ কিংবা ‘আমাদেরকে সংবাদ প্রদান করেছেন’ ইত্যাদি শব্দাবলী দ্বারা হাদীছের সনদ বর্ণনা করাকে ‘সামা’ বলা হয় (তায়সীরু মুছত্বলাহিল হাদীছ পৃঃ ১৫৯ প্রভৃতি)।]
তাহক্বীক্বের সারাংশ : এটা খুবই দুর্বল ও প্রত্যাখ্যাত বর্ণনা।
দলীল-৪ :
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ قَالَ: نا أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ الْمُقْرِيُّ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَيُّوبَ، عَنْ يَزِيدَ بْنِ حَبِيبٍ، عَنْ بُكَيْرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْأَشَجِّ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّهُ سُئِلَ عَنْ صَلَاةِ الْمَرْأَةِ، فَقَالَ: تَجْتَمِعُ وَتَحْتَفِر
ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করা হল মহিলাদের ছলাতে সম্পর্কে। তিনি বললেন, জড়সড় হয়ে এবং খুবই আঁটসাঁট হয়ে ছলাত পড়বে (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৭৭৮)।
জবাব : ছলাতের কোন রুকনকে আঁটসাঁট হয়ে আদায় করবে, উপরোল্লিখিত বর্ণনাটিতে এই বিষয়ের কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। বরং এর ভাষাটি হল ‘আম’ তথা ব্যাপক অর্থবোধক। একে ‘খাছ’ করার দলীল প্রয়োজন। যদি বলা হয় যে, সিজদায় আঁটসাঁট হয়ে সিজদা করবে (যেমনটি হানাফীগণ দাবী করেন), তাহ’লে এটি মারফূ‘ হাদীছের খেলাফ হবে। কারণ মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুকুম দিয়েছেন যে, তোমাদের কেউ যেন কুকুরের মত তার বাহুদ্বয়কে বিছিয়ে না দেয় (বুখারী হা/৮২২)।
বুখারীর এই হাদীছটি সম্পর্কে হানাফী ভাইগণ অনেক ব্যাখ্যাই দিয়ে থাকেন। সেগুলির দিকে দৃকপাত করতে গেলে বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি হয়ে যাবে। সেজন্য এ বিষয়ে শাইখ যুবায়ের আলী যাঈর অতি চমৎকার ইলযামী জবাবটি উপস্থাপন করা হল।
তিনি বলেছেন, এই হাদীছের মর্মের উপর তাক্বলীদপন্থীগণ অসংখ্য অভিযোগ করেছেন। কিন্তু দেওবন্দী মুফতী ছাহেবান-এর সত্যায়িত ফৎওয়াতে লেখা হয়েছে, এই বর্ণনায় কোন সন্দেহ নেই যে, এই হাদীছের সার্বজনীন অর্থে পুরুষ-নারী সহ পুরো উম্মত শরীক আছেন। এবং পুরো উম্মতের উপর আবশ্যক আছে যে, হযরত মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছলাতের যে ত্বরীক্বা রয়েছে, ঐ ত্বরীক্বাটিই পুরো উম্মতের জন্য হ’তে হবে। কিন্তু এটি স্পষ্ট হ’তে হবে যে, এই সার্বজনীন অর্থের উপর আমল ঐ সময় পর্যন্ত জরূরী যে সময় পর্যন্ত কোন শারঈ দলীল এর বিরোধী না হয়’ (মাজমূআ রাসায়েল ২/১০১; তাজাল্লিয়াতে ছফদর ৫/১১৪, ১১৫)।
দেখুন : তাহক্বীক্বী মাক্বালাত (১/২৪০)।
যাহোক, এ হুকুম নারী-পুরুষ সবার জন্যই প্রযোজ্য। একে পুরুষদের সাথে ‘খাছ’ করার জন্য মারফূ‘ হাদীছ প্রয়োজন। সুতরাং নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হুকুমকে ছাহাবীর প্রতি সম্বন্ধযুক্ত (অপ্রমাণিত) বক্তব্য দ্বারা প্রত্যাখ্যান করা যাবে না।
তদুপরি এটি ছহীহ নয়। শাইখ যুবায়ের আলী যাঈ বলেন, এই রেওয়ায়েতটি বুকায়ের বিন আব্দুল্লাহ ইবনুল আশাজ্জ সাইয়েদুনা ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু হ’তে বর্ণনা করেছেন (দেখুন মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৭৭৮, ১/২৭০)। বুকায়েরের সাইয়েদুনা ইবনে আব্বাস হ’তে সাক্ষাৎ হওয়া প্রমাণিত নয়। হাকেম বলেন,وقال الحاكم: “لم يثبت سماعه من عبد الله بن الحارث بن جزء وإنما روايته عن التابعين”.
আব্দুল্লাহ বিন হারেছ বিন জুয রাযিআল্লাহু আনহু (মৃঃ ৮৮ হিঃ) হ’তে তার সামা প্রমাণিত নয়। তার বর্ণনা তো ¯্রফে তাবেঈন হ’তে রয়েছে (তাহযীবুত তাহযীব ১/৪৯৩, অন্য সংস্করণ পৃঃ ৪৩৪)।
স্মর্তব্য যে, সাইয়েদুনা ইবনে আব্বাস ৬৮ হিজরীতে ত্বায়েফে মারা গিয়েছেন। যখন ৮৮ হিজরীতে মুত্যৃবরণকারী ছাহাবীর সাথে সাক্ষাৎ প্রমাণিত নেই তখন ৬৮ হিজরীতে মৃত্যুবরণকারী (ছাহাবী রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে (হাদীছ শ্রবণ) কিভাবে সাব্যস্ত হ’তে পারে?
ফলাফল : এই সনদটি মুনক্বাত্বি‘ অর্থাৎ যঈফ, প্রত্যাখ্যাত। (হাফেয যুবায়ের আলী যাঈ, তাহক্বীক্বী মাক্বালাত ১/২৩৩)।
ইবনে হিব্বান রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, وَكَانَ من صلحاء النَّاس من أهل الْمَدِينَة يروي عَن نَافِع এবং তিনি মদীনা বাসীদের মধ্য হ’তে সৎ ব্যক্তিদের মধ্য হ’তে ছিলেন। তিনি নাফে‘ হ’তে বর্ণনা করতেন। (দ্রঃ কিতাবুছ ছিক্বাত, রাবী নং ৬৯১৯)। অর্থাৎ তিনি তাবে তাবেঈন ছিলেন। যারা কোন ছাহাবীকে পান নি। হাফেয যাহাবী রহেমাহুল্লাহ বলেছেন مَعْدُوْدٌ فِي صِغَارِ التَّابِعِيْنَ তাকে ছোট তাবেঈ গণ্য করা হয়েছে (সিয়ারু আলামিন নুবালা (আর-রিসালা), রাবী নং ৮০)। হাফেয যাহাবী তার কতিপয় উস্তাদের নাম উল্লেখ করেছেন যাদের মাঝে ইবনু আব্বাস রাযিআল্লাহু-এর নাম বিদ্যমান নেই।
ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু হ’তে বুকায়ের হাদীছ শ্রবণ করেছেন মর্মে কোনই প্রমাণ নেই। সুতরাং এই রেওয়ায়েতটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার দরূণ যঈফ সাব্যস্ত হয়েছে। যা আমল এবং দলীলযোগ্য নয়।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ – মাক্বতূ‘ তথা তাবেঈনদের প্রতি সম্বন্ধযুক্ত বর্ণনাসমূহ

দলীল-১ :
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ قَالَ: نا وَكِيعٌ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ: إِذَا سَجَدَتِ الْمَرْأَةُ فَلْتَلْزَقْ بَطْنَهَا بِفَخِذَيْهَا، وَلَا تَرْفَعْ عَجِيزَتَهَا، وَلَا تُجَافِي كَمَا يُجَافِي الرَّجُلُ ইবরাহীম নাখাঈ বলেছেন, নারীরা যখন সিজদা করবে তখন তার পেটকে উরুর সাথে আঁটসাঁট করে রাখবে। এবং নিজের নিতম্বকে যেন (পরুষের ন্যায়) উপরে না তুলে। আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ঐরূপ দূরবর্তী করে না রাখে যেভাবে পুরুষেরা রাখে (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৭৮২)।
জবাব : এই বর্ণনাটিও যঈফ। কারণ-
এখানে সুফিয়ান ছাওরী রহেমাহুল্লাহ নামী একজন মুদাল্লিস রাবী রয়েছেন যিনি ‘আন’ (عَنْ) দ্বারা বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার আসক্বালানী রহমাতুল্লাহ আলাইহি তাঁর সম্পর্কে বলেছেন,سفيان ابن سعيد ابن مسروق الثوري أبو عبد الله الكوفي ثقة حافظ فقيه عابد إمام حجة من رؤوس الطبقة السابعة وكان ربما دلس সুফিয়ান ইবনু সাঈদ ইবনু মাসরূক্ব আছ-ছাওরী আবূ আব্দুল্লাহ আল-কূফী আস্থাভাজন, (হাদীছের) হাফেয, ফক্বীহ, ইবাদতগুযার, সপ্তম স্তরের শীর্ষস্থানীয় হুজ্জাত ইমামদের অন্তর্ভুক্ত। আর তিনি কখনো কখনো তাদলীস করতেন (তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ২৪৪৫)। জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী রহেমাহুল্লাহ (মৃঃ ৯১১ হিঃ) বলেছেন, سفيان الثوري
مشهور به بالتدليس সুফিয়ান ছাওরী তাদলীসে প্রসিদ্ধ (আসমাউল মুদাল্লিসীন, রাবী নং ১৮)। অর্থাৎ তিনি মুদাল্লিস রাবী হিসেবে প্রসিদ্ধ। ইবনুল ইরাক্বী রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, سفيان بن سعيد الثوري مشهور بالتدليس তিনি তাদলীসের কারণে প্রসিদ্ধ (আল-মুদাল্লিসীন, রাবী নং ২১)। বুরহানুদ্দীন হালাবী রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, سفيان الثوري مشهور به তিনি তাদলীসের জন্য বিখ্যাত (আত-তাবঈন, রাবী নং ২৫)। ইবনুত তুরকুমানী হানাফী বলেছেন, الثوري مدلس وقد عنعن (সুফিয়ান) ছাওরী মুদাল্লিস। এবং তিনি ‘আন’ শব্দে বর্ণনা করতেন (আল-জাওহারুন নাক্বী ৮/২৬২)। যাহাবী বলেছেন, كان يدلس عن الضعفاء তিনি যঈফদের থেকে তাদলীস করতেন (মীযানুল ইতিদাল, রাবী নং ৩৩২২)। বদরুদ্দীন আইনী হানাফী রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, وسُفْيَان من المدلسين এবং সুফিয়ান মুদাল্লিসদের মধ্য হ’তে রয়েছেন (উমদাতুল ক্বারী হা/২১৪ -এর আলোচনা দ্রঃ)। ইমাম নববী রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, أَنَّ سُفْيَانَ مُدَلِّسٌ নিশ্চয় সুফিয়ান হ’লেন মুদাল্লিস রাবী (শরহে ছহীহ মুসলিম ২/ ১৮২)। (বিস্তাতি জানতে দেখুন : শাইখ যুবায়ের আলী যাঈ, নূরুল আইনাঈন ফী ইছবাতি রফইল ইদায়েন, রফউল ইদায়েনের উপর রচিত ৬০৫ পৃষ্ঠাব্যাপী এই গ্রন্থটির অনুবাদ প্রকাশিতব্য)।
সুতরাং এই সনদ দ্বারা দলীল উপস্থাপন করা যাবে না।
এখন ইবরাহীম নাখাঈ রহেমাহুল্লাহ-এর কতিপয় বক্তব্য পেশ করা হল যেগুলি তাক্বলীদপন্থ’গণ অমান্য করেন।-
(ক) أَنَّهُ كَانَ يَمْسَحُ عَلَى الْجَوْرَبَيْنِ ইবরাহীম নাখাঈ কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করতেন (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/১৯৭৭)।
(খ) ওযূ রত অবস্থায় ইবরাহীম নাখাঈ স্ত্রীকে চুম্বন না করার প্রবক্তা ছিলেন। তিনি বলেছেন, إِذَا قَبَّلْتَ أَوْ لَمَسْتَ أَوْ بَاشَرْتَ، فَأَعِدِ الْوُضُوءَ যখন চুমু খাবে বা স্পর্শ করবে বা সংস্পর্শে থাকবে তখন পুণরায় ওযূ করবে (ইবনে আবী শায়বাহ হা/৫০৭)। অর্থাৎ তার নিকটে স্ত্রীকে চুম্বন করলে ওযু ভেঙ্গে যায় (ঐ, হা/৫০০)।
(গ) ইবরাহীম নাখাঈ রুকূতে ‘তাত্ববীক্ব’ করতেন। অর্থাৎ স্বীয় দু’হাতকে দুই উরুর মাঝে রাখতেন (ঐ, হা/২৫৪০, যুবায়ের আলী যাঈ এর সনদকে ছহীহ বলেছেন, তাহক্বীক্বী মাক্বালাত ১/২৩৭)।
(ঘ) ইবরাহীম নাখাঈ বলেছেন, تَقْعُدُ الْمَرْأَةُ فِي الصَّلَاةِ كَمَا يَقْعُدُ الرَّجُلُ
নারী ঐভাবে ছালাতে বসবে যেভাবে পুরুষ বসে (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৭৮৮ যুবায়ের আলী যাঈ এর সনদকে ছহীহ বলেছেন, ঐ)।
দলীল-২ :
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ قَالَ: نا جَرِيرٌ، عَنْ لَيْثٍ، عَنْ مُجَاهِدٍ أَنَّهُ كَانَ يَكْرَهُ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ بَطْنَهُ عَلَى فَخِذَيْهِ إِذَا سَجَدَ كَمَا تَضَعُ الْمَرْأَةُ ” মুজাহিদ হ’তে বর্ণিত, তিনি এই বিষয়টিকে মাকরূহ মনে করতেন যে, সিজদা করার সময় পুরুষ নারীদের মত তার পেটকে উরুর সাথে লাগিয়ে বসবে যেভাবে নারীরা রাখে (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৭৮০)।
তাহক্বীক্ব : এটি দুর্বল বর্ণনা। কারণ-
(১) এর সনদে লায়ছ বিন আবী সুলায়েম নামক রাবী আছেন। যিনি সত্যবাদী। কিন্তু শেষ বয়সে ইখতিলাত্বের শিকার হন। আর তাঁর হাদীছসমূহের মাঝে পার্থক্য করতে পারতেন না (কোন্ হাদীছটি ইখতিলাত্বের আগে আর কোনটি পরের তা বুঝতে পারতেন না)। এজন্য তার বর্ণিত হাদীছটি যঈফ।
(২) ইবনুল জাওযী রহেমাহুল্লাহ (মৃঃ ৫৯৭ হিঃ) লায়ছকে যঈফ বলেছেন (আত-তাহক্বীক্ব ফী মাসাইলিল খিলাফ হা/১৩১৫)।
(৩) আবুল হাসান ইবনুল ক্বাত্ত¡ান রহেমাহুল্লাহ (মৃঃ ৬২৮ হিঃ) বলেছেন, ، وَلم يكن بِالْحَافِظِ، وَهُوَ صَدُوق ضَعِيف তিনি হাফেয ছিলেন না। এবং তিনি সত্যবাদী, যঈফ (‘বায়ানুল ওয়াহমি ওয়াল ঈহাম ফী কুতুবিল আহকাম’ ৫/২৯৫)।
(৪) ইবনে আব্দুল হাদী রহেমাহুল্লাহ (মৃঃ ৭৪৪ হিঃ) বলেছেন, وذاك مع حفظه قد ضُعِّف …তাকে দূর্বল বলা হয়েছে (তানক্বীহুত তাহক্বীক্ব ৩/২৩৪)।
(৫) وليث هو ابن ابى سليم ضعفه البيهقى আর লায়ছ হ’লেন ইবনু আবী সুলায়েম। বাইহাক্বী তাকে যঈফ বলেছেন (আল-জাওহারুন নাক্বী ১/২৯৮)।
(৬) হাফেয যায়লাঈ রহেমাহুল্লাহ (মৃঃ ৭৬২ হিঃ) বলেছেন, مُتَكَلَّمٌ فِيهِ তাকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য রয়েছে (নাছবুর রায়াহ ২/৪৭৫); وَهُوَ ضَعِيفُ الْحَدِيث তিনি যঈফুল হাদীছ (৪/৩৩০)।
(৭) হাফেয হায়ছামী রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেছেন, وَهُوَ ثِقَةٌ، وَلَكِنَّهُ مُدَلِّسٌ তিনি নির্ভরযোগ্য, কিন্তু মুদাল্লিস (মাজমাউয যাওয়ায়েদ হা/ ৬৩৬৪)।
(৮) হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী রহেমাহুল্লাহ লিখেছেন, ضَعَّفَهُ الجمهور জমহুর বিদ্বানগণ তাকে যঈফ বলেছেন (ইতহাফুল মাহরাহ হা/২৭৬০)। তিনি অন্য গ্রন্থে বলেছেন, صدوق اختلط جدا ولم يتميز حديثه فترك তিনি সত্যবাদী। ব্যাপকভাবে ইখত্বিলাতের শিকার হয়েছিলেন। এবং তার হাদীছের মধ্যে পার্থক্য করতেন না। ফলে তাকে বর্জন করা হয়েছে (তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ৫৬৮৫)। তিনি তাকে মুদাল্লিসদের গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন (ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, নং ১৬/১৬৮)।
(৯) ইবনুল ক্বায়সারানী রহেমাহুল্লাহ তাকে যঈফ বলেছেন (মা‘রিফাতুত তাযকিরাহ, রাবী নং ২৬৮)।
(১০) ইমাম নাসাঈ রহমাতুল্লাহ আলাইহি তাকে যঈফ এবং পরিত্যাজ্য রাবীদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন (আয-যু‘আফাউল মাতরূকীন, রাবী নং ৫১১)।
(১১) ইবনে আদী আল-জুরজানী রহেমাহুল্লাহ (মৃঃ ৩৬৫ হিঃ) বলেছেন, তার সম্পর্কে একাধিক নির্ভরযোগ্য ইমামের ‘র্জাহ’ বা সমালোচনামূলক উক্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে (আল-কামিল ফী যু‘আফাইর রিজাল, রাবী নং ১৬১৭)।
(১২) ইবনে হিব্বান রহেমাহুল্লাহ (মৃঃ ৩৫৪ হিঃ) বলেছেন, وَكَانَ من الْعباد وَلَكِن اخْتَلَط فِي آخر عمره حَتَّى كَانَ لَا يدْرِي مَا يحدث بِهِ فَكَانَ يقلب الْأَسَانِيد তিনি ইবাদগুযারদের মধ্য হ’তে ছিলেন। কিন্তু শেষ বয়সে মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। এমনকি তিনি বুঝতেন না কি বর্ণনা করেছেন। আর তিনি সনদসমূহ উলট পালট করে ফেলতেন (আল-মাজরূহীন, রাবী নং ৯০৬)।
(১৩) হাফেয ইবনে শাহীন রহেমাহুল্লাহ (মৃঃ ৩৮৫ হিঃ) তাকে যঈফ এবং মিথ্যুকদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন (তারীখু আসমাইয যু‘আফা ওয়াল কায্যাবীন, রাবী নং ৫৩১)।
(১৪) ইবনুল জাওযী রহেমাহুল্লাহ তাকে যঈফ এবং পরিত্যাক্ত রাবীদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন (আয-যু‘আফাউল মাতরূকীন, নং ২৮১৫)।
(১৫) হাফেয যাহাবী রহেমাহুল্লাহ তার বিরুদ্ধে একাধিক সমালোচনামূলক উক্তি তুলে ধরেছেন। যেমন- ইমাম আহমাদ তাকে ‘মুযতারিবুল হাদীছ’ বলেছেন। ইয়াহইয়া এবং নাসাঈ তাকে যঈফ বলেছেন। ইবনে মাঈন বলেছেন, তাকে নিয়ে কোন অসুবিধা নেই। ইবনে হিব্বান বলেছেন, তার শেষ জীবনে হিফয বিকৃত হয়ে গিয়েছিল ইত্যাদি (মীযানুল ইতিদাল, রাবী নং ৬৯৯৭)।
(১৬) ইয়াহইয়া বিন মাঈন তাকে যঈফ বলেছেন (তারীখে ইবনে মাঈন, দারেমীর বর্ণনা, নং ৭২০)।
(১৭) আলবানী রহেমাহুল্লাহ তাকে যঈফ বলেছেন (সিলসিলাহ ছহীহা হা/২৫৪)।
(১৮) জাওজাযানী রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, ليث بن أبي سليم يضعف حديثه ليس بثبت লায়ছ হ’লেন ইবনে আবী সুলায়েম। তার হাদীছকে দুর্বল বলা হয়। তিনি মযবুত রাবী নন (আহওয়ালুর রিজাল, রাবী নং ১৩২)।
সুতরাং এই বর্ণনাটি দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে না।
মাওলানা আব্দুল মালেক সম্পাদিত ‘নবীজির নামায’ গ্রন্থে (পৃঃ ৩৮১) এই অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাটিকে পেশ করা হয়েছে।
দলীল-৩ :
عَنِ ابْنِ جُرَيْجٍ، قَالَ: قُلْتُ لِعَطَاءٍ: تُشِيرُ الْمَرْأَةُ بِيَدَيْهَا بِالتَّكْبِيرِ كَالرَّجُلِ؟ قَالَ: لَا تَرْفَعْ بِذَلِكَ يَدَيْهَا كَالرَّجُلِ وَأَشَارَ فَخَفَضَ يَدَيْهِ جِدًّا، وَجَمَعَهُمَا إِلَيْهِ جِدًّا، وَقَالَ: إِنَّ لِلْمَرْأَةِ هَيْئَةً لَيْسَتْ لِلرَّجُلِ، وَإِنْ تَرَكَتْ ذَلِكَ فَلَا حَرَجَ ইবনে জুরায়েজ রহেমাহুল্লাহ বলেছেন যে, আমি আত্বা -কে জিজ্ঞাসা করলাম, নারী কি তাকবীরের সময় পুরুষদের মত ইশারা করবে? তিনি বললেন, নারী পুরুষের মত হাত তুলবে না। এরপর তিনি ইশারা করলেন। তারপর তার দু’হাত নীচুতে রেখে (শরীরের সাথে) মিলিয়ে দিলেন। আর বললেন, নারীর পদ্ধতি পুরুষদের মত নয়। আর যদি এমনটি না করে তবে কোন অসুবিধা নেই (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/২৪৭৪)।
জবাব : (১) রেওয়াতটির শেষে আছে ‘যদি এমনটি না করে তবে কোন অসুবিধা নেই’ (ঐ)। এই বাক্যটির স্পষ্ট মর্ম এই যে, যদি পুরুষদের মত করে তবুও কোনই সমস্যা নেই।
(২) দেওবন্দীদের নির্ভরযোগ্য আলেম যাফর আহমাদ থানভী দেওবন্দী বলেছেন, فان قول التابعي لا حجة فيه নিশ্চয়ই তাবেঈর বক্তব্যের মাঝে কোন হুজ্জাত তথা দলীল নেই (ইলাউস সুনান ১/২৪৯, তাহক্বীক্বী মাক্বালাত ১/২২৬ -এর বরাতে)।
(৩) দেওবন্দী এবং ব্রেলভীগণ ইমাম আবূ হানীফা রহেমাহুল্লাহর তাক্বলীদ করেন। সুতরাং তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোন ছাহাবী রাযিআল্লাহু আনহু এবং তাবেঈ রহেমাহুল্লার বক্তব্য তাদের জন্য দলীল হ’তে পারে না।
(৪) ইমাম আত্বা বিন আবী রাবাহ’র কতিপয় মাসআলা তুলে ধরা হল যেগুলি তাক্বলীদপন্থীরা মানেন না। যেমন-
(ক) আত্বা বিন আবী রাবাহ (রহঃ) রুকূ‘র আগে এবং পরে রফ‘উল ইদায়েন করতেন (জুযউ রফ‘উল ইদায়েন হা/৬২, যুবায়ের আলী যাঈ রহেমাহুল্লাহ এর সনদকে হাসান বলেছেন, তাহক্বীক্বী মাক্বালাত ১/২২৭)।
(খ) আত্বা বলেছেন, أَنَا فَأَقْرَأُ مَعَ الْإِمَامِ فِي الظُّهْرِ وَالْعَصْرِ بِأُمِّ الْقُرْآنِ وَسُورَةٍ قَصِيرَةٍ، আমি যোহর এবং আছর ছলাতে ইমামের পিছে সূরা ফাতিহার পর আরেকটি ছোট সূরা পাঠ করি (মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক্ব হা/২৭৮৬, এখানে ইবনে জুরায়েজ ‘সামা’র বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। যুবায়ের আলী যাঈ একে ছহীহ বলেছেন, তাহক্বীক্বী মাক্বালাত ১/২২৭)।
(গ) তিনি বলেছেন, الْمَسْحُ عَلَى الْجَوْرَبَيْنِ بِمَنْزِلَةِ الْمَسْحِ عَلَى الْخُفَّيْنِ কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করা চামড়ার মোজার উপর মাসাহর উপর স্থলাভিষিক্ত (ইবনে আবী শায়বাহ হা/১৯৯১)।
সারাংশ : সুতরাং এই বর্ণনাটি তাক্বলীদপন্থীদের পক্ষে দলীল হ’তে পারে না।
উল্লেখ্য, এই বর্ণনাটি আব্দুল মালেক ছাহেব ‘নবীজির নামায’ গ্রন্থে (পৃঃ ৩৮১) উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিনি সনদের কোন মান উল্লেখ করেন নি। হাদীছটির মতনের ব্যাখ্যাও তিনি স্বীয় মুক্বাল্লাদ ইমাম হ’তে পেশ করেন নি।
দলীল-৪ : حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، قَالَ: أنا شَيْخٌ لَنَا , قَالَ: سَمِعْتُ عَطَاءً، سُئِلَ عَنِ الْمَرْأَةِ: كَيْفَ تَرْفَعُ يَدَيْهَا فِي الصَّلَاةِ؟ قَالَ: حَذْوَ ثَدْيَيْهَا হযরত আত্বা বিন আবী রাবাহ (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, ছালাতে মহিলা কতটুকু হাত উঠাবে? তিনি বললেন, বুক বরাবর (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৪৭১; নবীজীর নামায পৃঃ ৩৮১)।
জবাব : এটিও দেওবন্দী এবং ব্রেলভীদের পক্ষে দলীল হ’তে পারে না। এ সম্পর্কে শাইখ যুবায়ের আলী যাঈ (রহঃ) বলেছেন, “প্রতীয়মাণ হল যে, আবূ বকর বিন আবী শায়বাহ এবং আত্বা (মৃঃ ১১৪ হিঃ) এর মাঝে দু’টি সূত্র রয়েছে। তন্মধ্যে একটি সূত্র ‘ شَيْخٌ لَنَا ’ (আমাদের শাইখ) মাজহূল বা অজ্ঞাত আছেন। যাকে বিশেষ উদ্দেশ্যে উকাড়বী ছাহেবের নন্দিত অনুসারীরা বাদ দিয়েছেন। যেন সনদের যঈফ হওয়া স্পষ্ট হয়ে না যায়। মুহাম্মাদ তাক্বী উছমানী দেওবন্দী ছাহেব এবং অন্যান্যের সত্যায়িত ফৎওয়াতে লেখা হয়েছে যে, ‘এবং একজন তাবেঈর আমল যদিও উছূলের বিরোধী না হয়, তবুও তার দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে না (মাজমূ‘আ রাসায়েল ২/৯৯; তাজাল্লিয়াতে ছফদর ৫/১১৩)’।
নি¤েœাক্ত হযরতগণ এই ফৎওয়ার যিম্মাদার রয়েছেন।- (১) আমীন উকাড়বী। (২) মুহাম্মাদ তাক্বী উছমানী। (৩) মুহাম্মাদ বদর আলম ছিদ্দীক্বী। (৪) মুহাম্মাদ রাফী‘ উছমানী ইত্যাদি।
তো নিবেদন হল যে, আপনারা তাবেঈনদের উক্তিসমূহ কেনই বা পেশ করছেন? (তাহক্বীক্বী মাক্বালাত ১/২৩৯)।”
শাইখের পর্যালোচনা দ্বারা প্রতিভাত হল যে, এই সনদটি যঈফ। কারণ এখানে রাবী অজ্ঞাত রয়েছেন। তদুপরি এটি একজন তাবেঈর উক্তিমাত্র।
দলীল-৫ : حَدَّثَنَا رَوَّادُ بْنُ الْجَرَّاحِ، عَنِ الْأَوْزَاعِيِّ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ: تَرْفَعُ يَدَيْهَا
حَذْوَ مَنْكِبَيْهَا যুহরী রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেছেন, মহিলা কাঁধ পর্যন্ত হাত উত্তোলন করবে (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৪৭২; নবীজীর নামায পৃঃ ৩৮২)।
জবাব : এটি যঈফ বর্ণনা। এখানে রওয়াদ ইবনুল জার্রাহ নামী রাবী রয়েছেন। যিনি যঈফ। তাঁর সম্পর্কে ইমামদের বক্তব্যসমূহ নিম্নরূপ।-
(১) ইমাম দারেমী রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, وَسَأَلته عَن رواد بن الْجراح الْعَسْقَلَانِي فَقَالَ ثِقَة আমি তাকে (ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈনকে) রওয়াদ ইবনুল জার্রাহ আল-আসক্বালানী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তিনি ছিক্বাহ (তারীখে ইবনে মাঈন, দারেমীর বর্ণনা, রাবী নং ৩৩১)।
(২) ইমাম বুখারী বলেছেন, كَانَ قد اختلط তিনি ইখতিলাত্বের শিকার হয়েছিলেন (আত-তারীখুল কাবীর, রাবী নং ১১৩৯)।
(৩) ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বলেছেন, رواد بن الْجراح أَبُو عِصَام لَيْسَ بِالْقَوِيّ روى غير حَدِيث مُنكر وَكَانَ قد اخْتَلَط রওয়াদ ইবনুল জার্রাহ শক্তিশালী নন। তিনি একাধিক মুনকার হাদীছ বর্ণনা করেছেন। এবং তিনি ইখতিলাত্বের শিকার হয়েছিলেন (আয-যু‘আফাউল মাতরূকীন, রাবী নং ১৯৪)।
(৫) ইমাম ইবনে হিব্বান লিখেছেন, رواد بن الْجراح أَبُو عِصَام الْعَسْقَلَانِي يروي عَن الثَّوْريّ روى عَنهُ ابْنه عِصَام بن رواد وَأهل الشَّام كَانَ يخطىء وَيُخَالف রওয়াদ ইবনুল জার্রাহ আবূ ইছাম আসক্বালানী, তিনি ছাওরী হ’তে বর্ণনা করেন। তার থেকে তার পুত্র ইছাম বিন রওয়াদ এবং শামের অধিবাসীরা বর্ণনা করেছেন। তিনি ভুল করতেন এবং (ছিক্বাহ রাবীদের) বিরোধীতা করতেন (আছ-ছিক্বাত, রাবী নং ১৩২৫৪)।
(৫) ইমাম দারাকুৎনী (রহঃ) তাকে যঈফ এবং মাতরূক রাবীদের মধ্যে গণ্য করেছেন (আয-যুআফাউল মাতরূকীন, রাবী নং ২২৭)।
(৬) খলীলী রহেমাহুল্লাহ লিখেছেন, قَالَ الْحُفَّاظُ: كَثِيرًا مَا يُخْطِئُ رَوَى عَنْهُ شُيُوخُ الْعِرَاقِ وَالشَّامِ وَابْنُهُ (হাদীছের) হাফেযগণ বলেছেন, তিনি অত্যধিক ভুল করতেন। তার থেকে ইরাক ও সিরিয়ার শাইখগণ এবং তার পুত্র বর্ণনা করেছেন (আল-ইরশাদ ফী মা‘রিফাতি উলূমিল হাদীছ ২/৪৭০)।
(৭) ইবনুল জাওযী রহমাতুল্লাহ আলাইহি তাকে যঈফ এবং পরিত্যক্ত রাবীদের মাঝে গণ্য করেছেন। (আয-যু‘আফাউল মাতরূকীন, রাবী নং ১২৪০, আরবী পাঠ- رواد بن الْجراح أَبُو عِصَام الْعَسْقَلَانِي
يروي عَن الثَّوْريّ
أدخلهُ البُخَارِيّ فِي الضُّعَفَاء وَقَالَ قد اخْتَلَط لَا يكَاد يقوم حَدِيثه
وَقَالَ أَحْمد حدث عَن سُفْيَان أَحَادِيث مَنَاكِير وَقَالَ النَّسَائِيّ لَيْسَ بِالْقَوِيّ روى غير حَدِيث مُنكر وَقد اخْتَلَط
وَقَالَ الْأَزْدِيّ كل مَا يحدث بِهِ عَن سُفْيَان خطأ يُخَالف أَصْحَاب سُفْيَان
وَقَالَ الدَّارَقُطْنِيّ ضَعِيف وَقَالَ يحيى ثِقَة وَقَالَ الرَّازِيّ مَحَله الصدْق
)।
(১০) হাফেয যাহাবী রহমাতুল্লাহ আলাইহি বলেছেন, وعنه بن معين ووثقه وعباس الترقفي له مناكير ضعف ইবনে মাঈন এবং আব্বাস আত-তারকুফী তাকে ছিক্বাহ বলেছেন। তার কিছু আপত্তিকর, যঈফ বর্ণনা আছে (আল-কাশিফ, রাবী নং ১৫৯০)। তিনি তার ‘আল-মুগনী ফিয-যু‘আফা’ গ্রন্থে বলেছেন, رواد بن الْجراح الْعَسْقَلَانِي
سمع الْأَوْزَاعِيّ وَثَّقَهُ ابْن معِين بالشدة وَضَعفه الدَّارَقُطْنِيّ وَقَالَ أَبُو حَاتِم مَحَله الصدْق
وَله خبر مُنكر عَن سُفْيَان عَن مَنْصُور عَن ربعي عَن حُذَيْفَة রওয়াদ ইবনুল জার্রাহ আওযাঈ হ’তে শ্রবণ করেছেন। ইবনে মাঈন তাকে ছিক্বাহ বলেছেন। দারাকুৎনী তাকে যঈফ বলেছেন। আবূ হাতেম বলেছেন, তিনি সত্যবাদী স্তরের। “সুফিয়ান হ’তে, তিনি মানছূর হ’তে, তিনি রিবঈ হ’তে, তিনি হুযায়ফা হ’তে” -সনদে তার আপত্তিকর হাদীছ রয়েছে (রাবী নং ২১৩৪)। তিনি তার অপর আরেকটি গ্রন্থ ‘আল-মুক্বতানা ফী সারদিল কুনা’-তে বলেছেন, رواد (بن) الجراح العسقلاني، عن الأوزاعي، لين. রওয়াদ ইবনুল জার্রাহ আওযাঈ হ’তে (বর্ণনা করেছেন)। তিনি দুর্বল (রাবী নং ৪১৯৫)।
(১১) হাফেয আলাঈ তাকে মস্তিষ্ক বিকৃত রাবীদের মধ্যে উল্লেখ করেছেন (আল-মুখতালিত্বীন, রাবী নং ১৫)।
(১২) হাফেয বুরহানুদ্দীন আল-হালাবী তাকে মস্তিষ্ক বিকৃত রাবীদের মধ্যে উল্লেখ করেছেন (আল-ইগতিবাত্ব, রাবী নং ৩৮)।
(১৩) হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, لينه الحاكم أبو أحمد انتهى وذكره ابن حبان في الثقات. হাকেম তাকে দুর্বল বলেছেন। এবং ইবনে হিব্বান তাকে ‘আছ-ছিক্বাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন (লিসানুল মীযান, রাবী নং ৪০৮)। তিনি অন্য আরেকটি গ্রন্থে বলেছেন, صدوق اختلط بأخرة فترك وفي حديثه عن الثوري ضعف شديد من التاسعة তিনি সত্যবাদী। শেষ জীবনে ইখতিলাত্বের শিকার হয়েছিলেন। ফলে তাকে বর্জন করা হয়েছে। ছাওরী হ’তে বর্ণিত তার হাদীছের মধ্যে চরম দুর্বলতা আছে। তিনি সপ্তম স্তরের (রাবীদের) অন্যতম (তাক্বরীবুত তাহযীব, রাবী নং ১৯৫৮)।
(১৪) ‘মাওসূআতু আক্বওয়ালি আবিল হাসান আদ-দারাকুৎনী ফী রিজালিল হাদীছি ওয়া ইলালিহী’ গ্রন্থে আছে, قال البرقاني: سمعت الدَّارَقُطْنِيّ يقول أبو عصام رواد بن الجراح العسقلاني، متروك
ذكره الدَّارَقُطْنِيّ في الضعفاء والمتروكين
বুরক্বানী বলেছেন, আমি দারাকুৎনীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আবূ ইছাম রওয়াদ ইবনুল জার্রাহ হ’লেন মাতরূক বা পরিত্যাজ্য রাবী। দারাকুৎনী যঈফ এবং পরিত্যাজ্য রাবীদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন (রাবী নং ১২৭৭)।
(১৫) শাইখ আলবানী (রহঃ) বলেছেন, لأن في سنده رواد بن الجراح وفيه ضعف كما في الكاشف للذهبي কেননা এই সনদের মধ্যে রওয়াদ ইবনুল জার্রাহ রয়েছেন। তার মাঝে দুর্বলতা আছে। যেমনটি যাহাবীর ‘আল-কাশিফ’ গ্রন্থে আছে (তামামুল মিন্নাহ ১/৬৮)।
(১৬) হাফেয যায়লাঈ রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, رواد بن الْجراح وَهُوَ شَامي ضَعِيف রওয়াদুল ইবনুল জার্রাহ সিরিয়ার অধিবাসী। তিনি যঈফ বা দুর্বল (তাখরীজু আহাদীছিল কাশ্শাফ হা/১২৪০)।
(১৭) হাফেয হায়ছামী (রহঃ) বলেছেন, وَرَوَّادٌ فِيهِ ضَعْفٌ، وَقَدْ وَثَّقَهُ جَمَاعَةٌ، রওয়াদের মধ্যে দুর্বলতা আছে। এবং তাকে একটি দল ছিক্বাহ বলেছেন (মাজমাউয যাওয়ায়েদ হা/৭৪৯২)।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মাণ হল যে, মস্তিষ্ক বিকৃতির কারণে রওয়াদ ইবনুল জার্রাহ যঈফ রাবীতে পরিণত হয়েছেন। তাছাড়াও জমহুর মুহাদ্দিছ তাকে যঈফ বলেছেন। উপরন্তু এটি কোন মারফূ বা মাওকূফ হাদীছও নয়। যা শরীয়তের অকাট্য দলীল হ’তে পারে।
দলীল-৬ : عَنْ مَعْمَرٍ، عَنِ الْحَسَنِ، وَقَتَادَةَ، قَالَا: إِذَا سَجَدَتِ الْمَرْأَةُ فَإِنَّهَا تَنْضَمُّ مَا اسْتَطَاعَتْ، وَلَا تَتَجَافَى لِكَيْ لَا تَرْفَعَ عَجِيزَتَهَا হাসান বছরী এবং ক্বাতাদা রহেমাহুমাল্লাহ বলেছেন, মহিলা যখন সিজদা দিবে তখন সে যথাসম্ভব জড়সড় হয়ে থাকবে। (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ) ফাঁকা রেখে সিজদা দিবে না, যেন কোমর উঁচু হয়ে না থাকে (মুছান্নাফ আব্দুর রায্যাক্ব হা/৫০৬৮)।
জবাব : এটিও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এটি কোন মারফূ বা মাওকূফ হাদীছের সমর্থনপুষ্ট নয়। হাসান বছরী (রহঃ) এবং ক্বাতাদা (রহঃ) আমাদের ইমাম। তবে তারা আমাদের জন্য সর্বক্ষেত্রে হুজ্জাত বা দলীল নন। তাদের বক্তব্য কুরআন, হাদীছের সাথে মিলে গেলে আমরা তা মানতে বাধ্য। নতুবা তাদের কথা দলীল রূপে আমরা কবুল করতে পারি না।
এই বর্ণনাটিকে ‘নবীজীর নামায’ গ্রন্থে (পৃঃ ৩৮২) লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
দলীল- ৭ : حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ قَالَ: نا أَبُو الْأَحْوَصِ، عَنْ مُغِيرَةَ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ: إِذَا سَجَدَتِ الْمَرْأَةُ فَلْتَضُمَّ فَخِذَيْهَا، وَلْتَضَعْ بَطْنَهَا عَلَيْهِمَا ইবরাহীম নাখাঈ রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, যখন নারীরা সিজদা করবে তখন যেন তার উরুদ্বয়কে মিলিয়ে রাখে। এবং তার পেটকে উভয় উরুর সাথে মিলিয়ে রাখে (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৭৭৯)।
জবাব : ইবরাহীম নাখাঈ (রহঃ) একজন তাবেঈ মাত্র। তাঁর উক্তি যদি কুরআন এবং হাদীছের দলীল কৃর্তক স্বীকৃতি পায় তবেই মানতে হবে। নতুবা নয়। এখানে তাঁর অত্র বক্তব্যের পক্ষে কোন আয়াত বা হাদীছ বা আছারে ছাহাবা আমরা পাই নি। অতএব এটি দলীলের অযোগ্য।
দলীল-৮ : عَنْ مَعْمَرٍ، وَالثَّوْرِيِّ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ قَالَ: كَانَتْ تُؤْمَرُ الْمَرْأَةُ أَنْ تَضَعَ ذِرَاعَهَا وَبَطْنَهَا عَلَى فَخِذَيْهَا إِذَا سَجَدَتْ، وَلَا تَتَجَافَى كَمَا يَتَجَافَى الرَّجُلُ، لِكَيْ لَا تَرْفَعْ عَجِيزَتَهَا ইবরাহীম নাখাঈ রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, মহিলাদেরকে সিজদা করার সময় তাদের হাত এবং পেটকে উরুর সাথে মিলিয়ে রাখার বিষয়ে আদেশ করা হ’ত। এবং পুরুষের ন্যায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফাঁকা না রাখে, যাতে কোমর উঁচু না হয়ে থাকে (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/৫০৭১)।
জবাব : এটি যঈফ রেওয়াত। এখানে দু’টি বিষয় লক্ষণীয়।- (১) সুফিয়ান ছাওরী রহেমাহুল্লাহ তাদলীস করেছেন। (২) এটি একজন তাবেঈর বক্তব্য মাত্র। যা কোন দলীল নয়।
দলীল-৯ :
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ قَالَ: نا إِسْمَاعِيلُ بْنُ عُلَيَّةَ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ، عَنْ زُرْعَةَ بْنِ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ خَالِدِ بْنِ اللَّجْلَاجِ، قَالَ: كُنَّ النِّسَاءُ يُؤْمَرْنَ أَنْ يَتَرَبَّعْنَ إِذَا جَلَسْنَ فِي الصَّلَاةِ، وَلَا يَجْلِسْنَ جُلُوسَ الرِّجَالِ عَلَى أَوْرَاكِهِنَّ، يُتَّقَى ذَلِكَ عَلَى الْمَرْأَةِ مَخَافَةَ أَنْ يَكُونَ مِنْهَا الشَّيْءُ খালেদ বিন লাজলাজ রহেমাহুল্লাহ বলেছেন, নারীদেরকে আদেশ করা হ’ত তারা যেন ছালাতে দু’ পা ডান দিক দিয়ে বের করে নিতম্বের উপর বসে, পুরুষদের মত (যেন) না বসে। (আবরণযোগ্য) কোন কিছু প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার আশংকায় মহিলাদেরকে এমনটি করতে হয় (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৭৮৩; নবীজীর নামায পৃঃ ৩৮৩)।
জবাব : যদি এখানে মুহাম্মাদ বিন ইসহাক্ব বিন ইয়াসার নামী বিখ্যাত মুদাল্লিস রাবী থেকে থাকেন, তবে এটি যঈফ। ইবনে হাজার রহেমাহুল্লাহ তাঁকে মুদাল্লিস বলেছেন (ত্বাবাক্বাতুল মুদাল্লিসীন, জীবনী নং ১২৫/৪)। এখানে তিনি আন শব্দে বর্ণনা করেছেন। তাই এই সনদটি তাদলীসের কারণে যঈফ। তাছাড়াও এটি কোন আয়াত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীছ বা ছাহাবীদের ইজমাঈ কোন বক্তব্যও নয়, যা মানতে উম্মত বাধ্য থাকবে।
উপরোক্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে, নারী-পুরুষের ছলাতের প্রচলিত পার্থক্য সমূহ সঠিক নয়। বিশেষ করে নারীদের জড়সড় হয়ে সিজদা দেওয়ার নিয়ম বিশুদ্ধ নয়। মূলতঃ ছলাত আদায়ের পদ্ধতি ও তাসবীহ তাহলীলের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবে নারীরা জামাআতে ছলাত আদায়ের ক্ষেত্রে ইমাম একই কাতারের মাঝ বরাবর দাঁড়াবে, ছলাতে ক্রুটি হ’লে মুক্তাদী নারী হাতের উপর হাত মেরে সতর্ক করবে। এছাড়া আর কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহ আমাদের ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী ছলাত আদায়ের তাওফীক দান করুন-আমীন!

দ্বিতীয় অধ্যায়

মহিলারা কি মসজিদে ছালাত পড়তে পারবে?
‘নারীরা মসজিদে জামাআতের সাথে ছলাত পড়তে পারবে কি না’- এ বিষয়ে অহেতুক তর্ক বিতর্ক না করে নি¤েœাক্ত কতিপয় দলীলের প্রতি লক্ষ্য করলেই সমাধান মিলবে ইনশাআল্লাহ।
দলীল-১ : عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِذَا اسْتَأْذَنَكُمْ نِسَاؤُكُمْ بِاللَّيْلِ إِلَى المَسْجِدِ، فَأْذَنُوا لَهُنَّ ইবনে ওমর রাযিআল্লাহু তাআলা আনহুমা হ’তে বর্ণিত। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের নারীরা রাতে মসজিদে যেতে অনুমতি চায় তখন তাদের অনুমতি প্রদান কর (ছহীহ বুখারী হা/৮৬৫)।
দলীল-২ : أَنَّ أُمَّ سَلَمَةَ، زَوْجَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَخْبَرَتْهَا: أَنَّ النِّسَاءَ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُنَّ إِذَا سَلَّمْنَ مِنَ المَكْتُوبَةِ، قُمْنَ وَثَبَتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَنْ صَلَّى مِنَ الرِّجَالِ مَا شَاءَ اللَّهُ، فَإِذَا قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ الرِّجَالُ হিন্দ বিনতে হারেছ হ’তে বর্ণিত। নিশ্চয়ই উম্মে সালামাহ রাযিআল্লাহু তাআলা আনহা তাকে জানিয়েছেন যে, নারীরা আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় ফরয ছালাতের সালাম ফিরানোর সাথে সাথে উঠে যেতেন এবং আল্লাহর রাসূল এবং তার সাথে ছালাত আদায়কারী পুরুষগণ, আল্লাহ যতক্ষণ ইচ্ছা করেন অবস্থান করতেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল দাঁড়াতেন, তখন পুরুষরাও উঠে যেতেন (বুখারী হা/৮৬৬)।
দলীল-৩ : عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: إِنْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيُصَلِّي الصُّبْحَ، فَيَنْصَرِفُ النِّسَاءُ مُتَلَفِّعَاتٍ بِمُرُوطِهِنَّ، مَا يُعْرَفْنَ مِنَ الغَلَسِ আয়েশাহ রাযিআল্লাহু তাআলা আনহা হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ফজরের ছালাত শেষ করতেন, তখন নারীরা চাদরে সর্বাঙ্গে আচ্ছাদিত করে ঘরে ফিরতেন। অন্ধকারের দরূণ তাদেরকে (তখন) চেনা যেত না (বুখারী হা/৮৬৭)।
দলীল-৪ : عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: لَوْ أَدْرَكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا أَحْدَثَ النِّسَاءُ لَمَنَعَهُنَّ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ قُلْتُ لِعَمْرَةَ: أَوَمُنِعْنَ؟ قَالَتْ: نَعَمْ আয়েশাহ রাযিআল্লাহু তাআলা আনহা হ’তে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, যদি আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন যে, নারীরা কী অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তাহ’লে বাণী ইসরাঈলের নারীদের যেমন বারণ করা হয়েছিল তেমনি এদেরও মসজিদে আসা নিষেধ করতেন। (রাবী বলেন) আমি আমরাহ রাযিআল্লাহু তাআলা আনহুকে জিজ্ঞেস করলাম, তাদের কি নিষেধ করা হয়েছিল? তিনি বললেন, হাঁ (বুখারী হা/৮৬৯)। এই হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মাণ হল যে, নারীদের নিষেধাজ্ঞামূলক হুকুমটি মানসূখ বা রহিত হয়ে গিয়েছে। যা আগের শরীয়তে ছিল। এখনকার শরীয়তে অত্র হুকুমটি গ্রহণযোগ্য না।
দলীল-৫ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنِّي لَأَقُومُ إِلَى الصَّلاَةِ وَأَنَا أُرِيدُ أَنْ أُطَوِّلَ فِيهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ فِي صَلاَتِي كَرَاهِيَةَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمِّهِ রসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি ছালাতে দাঁড়াই। আর আমি তাতে তথা ছালাতের মধ্যে দীর্ঘায়িত করতে ইচ্ছা করি। অতঃপর শিশুর কান্না শুনতে পেয়ে আমি ছালাত সংক্ষিপ্ত করি এই আশংকায় যে, (বাচ্চার কান্না) তার মায়ের উপর কষ্টদায়ক হবে (বুখারী হা/৮৬৮)।
দলীল-৬ : أن أَنَس بْن مَالِكٍ، حَدَّثَهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنِّي لَأَدْخُلُ فِي الصَّلاَةِ وَأَنَا أُرِيدُ إِطَالَتَهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ فِي صَلاَتِي مِمَّا أَعْلَمُ مِنْ شِدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ مِنْ بُكَائِهِ নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ছালাতের মধ্যে প্রবশে করি। এবং আমি তা দীর্ঘ করার ইচ্ছা করি। কিন্তু (পরে) শিশুর কান্না শ্রবণ করি। ফলে আমার ছালাতের মধ্যে সংক্ষেপ করে ফেলি। কেননা, শিশু কাঁদলে মায়ের মন যে খুবই বিষন্ন হয়ে পড়ে তা আমি জানি (বুখারী হা/৭০৯)।
দলীল-৭ : أَنَّهُ قَالَ: إِذَا شَهِدَتْ إِحْدَاكُنَّ الْعِشَاءَ فَلَا تَطَيَّبْ تِلْكَ اللَّيْلَةَ রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্য হ’তে কোন নারী এশার ছালাতে (জামাআতের জন্য মসজিদে) হাযির হয়, তখন যেন সে অত্র রাতে সুগন্ধি না লাগায় (মুসলিম হা/৪৪৩)।
দলীল-৮ : عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ اللَّهِ، وَلَكِنْ لِيَخْرُجْنَ وَهُنَّ تَفِلَاتٌ আবূ হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নারীদেরকে আল্লাহর মসজিদসমূহ থেকে নিষেধ করবে না। কিন্তু তারা যেন (সুগন্ধি ব্যতিত) সাদা-মাটা কাপড়ে বের হয় (আবূ দাঊদ হা/৫৬৫)।
দলীল-৯ : عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ، قَالَ: كَانَ رِجَالٌ يُصَلُّونَ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَاقِدِي أُزْرِهِمْ عَلَى أَعْنَاقِهِمْ، كَهَيْئَةِ الصِّبْيَانِ، وَيُقَالُ لِلنِّسَاءِ: لاَ تَرْفَعْنَ رُءُوسَكُنَّ حَتَّى يَسْتَوِيَ الرِّجَالُ جُلُوسًا সাহল বিন সা‘দ হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, লোকেরা শিশুদের ন্যায় নিজেদের লুঙ্গি কাঁধে বেঁধে ছালাত আদায় করত। আর নারীদেরকে বলা হল, পুরুষদের সোজা হয়ে বসা পর্যন্ত তোমরা তোমাদের মাথা উত্তোলন করবে না (বুখারী হা/৩৬২)।
দলীল-১০ : عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: كَانَتِ امْرَأَةٌ لِعُمَرَ تَشْهَدُ صَلاَةَ الصُّبْحِ وَالعِشَاءِ فِي الجَمَاعَةِ فِي المَسْجِدِ، فَقِيلَ لَهَا: لِمَ تَخْرُجِينَ وَقَدْ تَعْلَمِينَ أَنَّ عُمَرَ يَكْرَهُ ذَلِكَ وَيَغَارُ؟ قَالَتْ: وَمَا يَمْنَعُهُ أَنْ يَنْهَانِي؟ قَالَ: يَمْنَعُهُ قَوْلُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لاَ تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ مَسَاجِدَ اللَّهِ ইবনে ওমর হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, ওমর- এর একজন স্ত্রী ফজর এবং ইশার ছালাতের জামাআতে মসজিদে হাযির হ’তেন। তাকে বলা হল, আপনি কেন বের হন? অথচ আপনি জানেন যে, ওমর রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু এটি অপসন্দ করেন এবং মর্যাদা হানিকর মনে করেন? তিনি বললেন, তাহ’লে আমাকে নিষেধ করতে কিসে তাকে বাঁধা দিচ্ছে? বলা হল, তাকে বাঁধা দেয় আল্লাহর রাসূলের বাণী- ‘আল্লাহর দাসীদের আল্লাহর মসজিদে যেতে বারণ কর না’ (বুখারী হা/৯০০)।
দলীল-১১ : النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِذَا اسْتَأْذَنَتْ أَحَدَكُمُ امْرَأَتُهُ إِلَى الْمَسْجِدِ فَلَا يَمْنَعْهَا নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের কোন নারী তার কাছে মসজিদে আসার অনুমতি চায় তখন সে যেন তাকে নিষেধ কর না (মুসলিম হা/৪৪২)।
দলীল-১২ : أَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: لَا تَمْنَعُوا نِسَاءَكُمُ الْمَسَاجِدَ إِذَا اسْتَأْذَنَّكُمْ إِلَيْهَا قَالَ: فَقَالَ بِلَالُ بْنُ عَبْدِ اللهِ: وَاللهِ لَنَمْنَعُهُنَّ، قَالَ: فَأَقْبَلَ عَلَيْهِ عَبْدُ اللهِ: فَسَبَّهُ سَبًّا سَيِّئًا مَا سَمِعْتُهُ سَبَّهُ مِثْلَهُ قَطُّ وَقَالَ: ” أُخْبِرُكَ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَتَقُولُ: وَاللهِ لَنَمْنَعُهُ আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু বলেছেন, আমি রসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের নারীদেরকে মসিজদসমূহ যেতে বাঁধা দিবে না যখন তারা তোমাদের কাছে অনুমতি চাইবে। তিনি বললেন, বিলাল বিন আব্দুল্লাহ বলল, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই তাদেরকে বাধা দিব। তিনি বললেন, তার প্রতি আব্দুল্লাহ এগেিয় গেলেন। তিনি তাকে এমন ভর্ৎসনা করলেন যা আমি কখনোই শ্রবণ করিনি। তিনি বললেন, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হ’তে সংবাদ দিচ্ছি আর তুমি বলছ, আল্লাহর কসম! আমি তাকে বাঁধা দিব। (ঐ)।
দলীল-১৩ : سُئِلَ الْحَسَنُ عَنِ امْرَأَةٍ جَعَلَتْ عَلَيْهَا إِنْ أُخْرِجَ زَوْجُهَا مِنَ السِّجْنِ أَنْ تُصَلِّيَ فِي كُلِّ مَسْجِدٍ تُجْمَعُ فِيهِ الصَّلَاةُ بِالْبَصْرَةِ رَكْعَتَيْنِ، فَقَالَ الْحَسَنُ: تُصَلِّي فِي مَسْجِدِ قَوْمِهَا হাসান বাছরীকে একজন নারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। যিনি তার স্বামীকে জেল হ’তে বের করার জন্য এই মর্মে মানত করেছিলেন যে, তিনি বছরার প্রতিটি মসজিদে দু’রাকআত ছালাত পড়বেন যেখানে জামা‘আত অনুষ্ঠিত হয়। হাসান বললেন, সে যেন তার গোত্রের মসজিদে ছালাত পড়ে (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/৭৬১৮; শাইখ যুবায়ের আলী যাঈ (রহঃ) ছহীহ বলেছেন, তাহক্বীক্বী মাক্বালাত ৩/২০১)।
দলীল-১৪ : عَنِ ابْنِ عُمَرَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ائْذَنُوا لِلنِّسَاءِ بِاللَّيْلِ إِلَى المَسَاجِدِ তোমরা নারীদেরকে রাতে মসজিদে যেতে অনুমতি দিবে (বুখারী হা/৮৯৯)।
‘নবীজির নামায’ গ্রন্থে আছে, যদি মহিলা মুক্তাদীরা প্রথমে ইমামের ভুল ধরতে পারেন তাহ’লে তারা হাতের উপর চাপড় দিবেন, মুখে আওয়াজ করবেন না। কেননা, তাদের কন্ঠস্বরও পর্দার অন্তর্ভুক্ত (নবীজীর নামায পৃঃ ২১৩)।
এর দ্বারা প্রতীয়মাণ হল যে, মহিলারা জামাআতের সাথে ছালাত আদায় করতে পারবেন। মসজিদে হোক বা বাসায় হোক। পুরুষ ইমামের পিছে হোক বা নারী ইমামের সাথে।
এখানে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে যে, সে সময় ফেতনা ছিল না তাই নারীদের মসজিদে যাওয়া নিরাপদ ছিল। কিন্তু এখন যেহেতু ফেতনার যুগ তাই নারীদের মসজিদে যাওয়া হারাম বা অনুচিৎ। এর জবাব আমরা হাদীছেই পাবো। ‘সুনানে তিরমিযী’-তে আছে, عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ امْرَأَةً خَرَجَتْ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تُرِيدُ الصَّلَاةَ، فَتَلَقَّاهَا رَجُلٌ فَتَجَلَّلَهَا، فَقَضَى حَاجَتَهُ مِنْهَا একজন মহিলা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ছালাত পড়ার অভিপ্রায়ে বের হল। একজন ব্যক্তি তাকে ধরে ফেলল এবং তাকে চাদরের ভিতরে জড়িয়ে ধরলো। অতঃপর সে (লোকটি) তার চাহিদা পূরণ করল (তিরমিযী হা/১৪৫৪; মিশকাত হা/৩৫৭২; আবূ দাঊদ হা/৪৩৭৯; নাছিরুদ্দীন আলবানী রজম করার অংশটুকু বাদে হাসান বলেছেন; যুবায়ের আলী যাঈ হাসান বলেছেন, তাহক্বীক্ব মিশকাতুল মাছাবীহ হা/৩৫৭২, ২/৪৩৪)।
ধর্ষণের চাইতে বড় ফেতনা আর কি হ’তে পারে? এরপরও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদেরকে মসজিদে যেতে বাঁধা দেন নি। সুতরাং আজকে ফেতনা হবে বলে যারা মসজিদে আসতে নারীদের বাঁধা প্রদান করেন তারা ভুল করছেন কি না তা ভেবে দেখার অনুরোধ রইল। তাবলীগী মহিলারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে তালীমী বৈঠক করেন। তাতে কি ফেতনার আশংকা নেই? মাজার-দরবারে নারী-পুরুষের ভিড়ে কি ফেতনার আশংকা নেই? অবশ্যই রয়েছে। অথচ এনারা এ সকল স্থানে নারীদের যেতে নিষেধ করেন না।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে থাকার তওফীক্ব দিন। এবং বাতিল হ’তে আমাদের হেফাযত করুন। আমীন।