মূলঃ মুহাম্মাদ বিন ‘উমার বাযমুল
ভাষান্তরঃ আবু হিশাম মুহাম্মাদ ফুয়াদ

 

মূলনীতিঃ দ্বীনের ইলম অর্জনে – একজন মুসলিমের জন্য যে কাজগুলো করা বাধ্যতামূলক তা সম্পর্কে ইলম অর্জন তার জন্য ফরজ। আর এই সীমার বাইরে যে বিষয়গুলো রয়েছে তা সম্পর্কে ইলম অর্জন করা সামষ্টিক ফরজ বা ফারজে কিফায়াহ। এগুলো তুল্লাবুল ইলমের জন্য অতিরিক্ত বিষয় তবে একজন ত্বলিবে ইলমের এ উলুম অর্জন করা উচিত।

 

এ বিষয়ের প্রমাণ রয়েছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিসে, তিনি বলেছেনঃ “ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ।”

আরেকটি প্রমাণ হল,

আমাদের সমগ্র দ্বীন মাত্র দুটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিতঃ
১। আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত করিনা।
২। তিনি যে উপায়সমূহ বলে দিয়েছেন তার বাইরে অন্য কোন উপায়েও আমরা তার ইবাদাত করিনা।

আল্লাহ আমাদের যে জন্য সৃষ্টি করেছেন ও আমাদের জন্য যে ইবাদত গুলো অত্যবশ্যকীয় করে দিয়েছেন, তা সম্পর্কে জানার চেষ্টা না করা পর্যন্ত এবং না জানা পর্যন্ত কারো পক্ষেই সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ইবাদত করা সম্ভব নয়।

এই বিষয়টিকেই ব্যাখ্যা করে ইসহাক বিন রাহাওয়াইহ বলেছেন, ” ইলম অর্জন করা ফরজ, যদিও এ সম্পর্কে আসা বর্ণনাটি সহীহ নয়। যাহোক, এর অর্থ হল, একজন ইলম অন্বেষণকারীর জন্য জানা অত্যবশ্যক যে কীভাবে উযু করতে হয়, সালাত আদায় করতে হয়, ধনসম্পদ থাকলে কীভাবে তার যাকাত ও হজ আদায় করতে হয় ইত্যাদি। ”

তিনি আরও বলেন, “যে ইলম অর্জন করা ফরজ তা অর্জনে বের হওয়ার জন্য মা-বাবার অনুমতির প্রয়োজন নেই। তবে এর বাইরে যেকোনো ইলম অর্জনে মা-বাবার অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত বের হওয়া উচিত নয়। ” [১]

ইবনে তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন,
“ইলম অর্জন করা ফরজে কেফায়াহ। তবে, প্রত্যেকের জন্য যা করা অত্যাবশ্যক, যেমন আল্লাহ কী করতে ও কী থেকে বিরত থাকতে আদেশ করেছেন, তা সম্পর্কে ইলম অর্জন করা ফরজে আইন অর্থাৎ তা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই ফরজ।” [২]

এই মূলনীতির ভিত্তিতেই আহলুল হাদিসদের অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়। এবং এ জন্যই বিদআতিরা সর্বদায় আহলুল হাদিসদের সম্পর্কে বলে ওদের মূল লক্ষ্য হল উযু, নামায আর এই ধরণের (ফুরু’ঈ) বিষয়গুলো।

কিন্তু আসলে, এতে কোন দোষ নেই, সঠিকভাবে উযু করতে শিখলে আমরা সালাতের চাবি পাই, যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“সালাতের চাবি হল উযু। এর (প্রবেশপথ অর্থে) তাহরিম হল তাকবীর (আল্লাহু আকবার বলা) আর তাহলিল হল তাসলিম (অর্থাৎ সালাম ফেরানো)।” [৩]

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “পাঁঁচটি স্তম্ভের উপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত। এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ নেই ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রসূল, সালাত ক্বায়িম করা, যাকাত আদায় করা, হাজ্জ পালন করা এবং রমাযান মাসের সিয়াম পালন করা। ” [৪]

আর তাই, একজন ত্বলিবে ইলমের জন্য প্রথম উপদেশ হল, যে বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক, প্রথমে তার জ্ঞান অর্জন করতে প্রচেষ্টা চালানো। ইমাম মালিককে ইলম অর্জন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “(ইলম) এর সবকিছুই ভালো। তবে (প্রথমে) খুঁজে বের করো কোনটি তোমার দৈনন্দিন জীবনে, সকাল-সন্ধ্যায় প্রয়োজন, তারপর সে বিষয়ে ইলম অন্বেষণ করো।”

 

এর কারণ, আল্লাহ তার ইবাদতের জন্য আমাদের কোন কোন পথ বলে দিয়েছেন, আমাদের কোন বিধিবিধান দিয়েছেন, তা না জানা পর্যন্ত আমরা প্রকৃতপক্ষে তার ইবাদাত করতে পারবো না। আর আপনি যখন এ ইলমগুলো অর্জন করবেন তখন আপনি জেনে যাবেন কীভাবে উজু করতে হয়, কীভাবে সালাত আদায় করতে হয়, কীভাবে গুসল করতে হয়, নিসাব পরিমাণ অর্থ হলে কীভাবে যাকাত দিতে হয়, কীভাবে হজ করতে হয়। আপনার যদি বিবাহ করতে ইচ্ছে হয় আপনি বিবাহ সম্পর্কে ইলম অর্জন করবেন, আপনার যদি তালাকের ইচ্ছে হয় তবে আপনি তালাকের বিধিবিধানগুলো জানবেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

ইলম অর্জনের এই মূলনীতিতে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তঃ

 

১। ফরজের বিধিবিধান। এটি নির্দেশ করে যে, একজন মুসলিম তার কর্মগুলোর জন্য দায়ী এবং জবাবদিহি করতে বাধ্য। সে যদি নাবালেগ হয় সেক্ষেত্রে তার মা বাবার দায়িত্ব তাকে তার দ্বীনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো শেখানো। কারণ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল এবং তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল যেমন রাখাল তার পালের প্রতি।” [৫]

 

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেনঃ

 

يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا قُوٓا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلٰٓئِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَآ أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

 

হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর; যেখানে রয়েছে নির্মম ও কঠোর ফেরেশতাকূল, আল্লাহ তাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তারা সে ব্যাপারে তার অবাধ্য হয় না। আর তারা তা-ই করে যা তাদেরকে আদেশ করা হয়। [৬]

 

২। একজন ত্বলিবে ইলমকে অবশ্যই ঔচিত্যের চেয়ে আবশ্যিকতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ যে বিষয়টি তার জানা ‘উচিত’, তার চেয়ে জানা ‘আবশ্যক’ এমন বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ইলমের আবশ্যক বিষয়গুলো ছেড়ে, অনাবশ্যক বিষয়গুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকা ইলম অর্জনের পথে অন্যতম বড় বাধা।

 

যেমন ধরুন, আপনি হয়তো কাউকে আরবি ভাষা, ব্যকরণ ও অলংকার শাস্ত্রের অনেক গভীর বিষয় ও পরিভাষা নিয়ে কথা বলতে দেখছেন কিন্তু সে ঠিকমতো উযুও করতে জানে না আবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পদ্ধতিতে সালাতও আদায় করতে পারেনা।

 

৩।  একজন ত্বলিবে ইলম দ্বীনের অনাবশ্যক বিষয় সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বা যেকোনো প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে তার মা বাবার বিরুদ্ধাচরণ করবে না। তবে সেটি যদি ফরজ কোন বিষয় বা দৈনন্দিন সকাল-সন্ধ্যার প্রয়োজনীয় কোন বিষয় হয় তবে সে চেষ্টা করবে এবং ভ্রমণ করতে পারবে, যেমনটি ইমাম ইসহাকের উক্তি আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি।

 

৪। সহযোগী শাস্ত্রসমূহ, আলেমগণ যাকে প্রায়োগিক শাস্ত্র বলে থাকেন, যেমনঃ আরবি ভাষা, উসুল শাস্ত্র, মুছত্বলাহুল হাদিস, উসুলে ক্বুর’আন ইত্যাদি- একজন ত্বলিবে ইলম এগুলো থেকে ততটুকু অর্জনে সচেষ্ট হবে যতটুকু তাকে তার সৃষ্টির প্রধান উদ্দেশ্য অর্থাৎ যথাযথভাবে আল্লাহর ইবাদতে সাহায্য করবে। আর তা যদি তা না করা হয় তবে তা ইলমের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি হবে, আল্লাহু আ’লাম।

এজন্য একজন ত্বলিবে ইলমের কখনোই সিবাওয়েইহ এর মতো ব্যকরণে পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন নেই, আবার আল খালিল এবং আল আযহারির মতো আরবি ভাষায় অথবা বালাগাতে আল জিজরানির মতো পাণ্ডিত্যেরও দরকার নেই। তার জন্য ততটুকুই যথেষ্ট যা তাকে আল্লাহর কালাম ও সুন্নাহ ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

পাদটীকা

[১] [জামি’ বায়ানুল ইলমি ওয়া ফাদলিহি ১/৯]
[২] [মাজমু’ ফাতওয়া ২৮/৮০]
[৩] [আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর রেওয়ায়েত, এসেছে সুনানে আবু দাউদ, পবিত্রতা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ উযুর ফরয (৬১ নম্বর), সুনানে তিরমিযিঃ পবিত্রতা অধ্যায়ঃ সালাতের চাবি উযু সম্পর্কে রেওয়ায়েত অনুচ্ছেদ (৩ নম্বর), সুনানে ইবনে মাযাহঃ পবিত্রতা অধ্যায়ঃ সালাতের চাবি উযু- অনুচ্ছেদ (২৭ নম্বর)]

[৪] [হাদিসটি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারি হাদিসটি তার সাহীহ তে এনেছেন; ইমান অধ্যায়; হাদিস নম্বর ৮। ইমাম মুসলিম তার সাহীহ তে এনেছেন, ইমান অধ্যায়, হাদিস নম্বর ১৬]
[৫] [সহীহ বুখারি তে একাধিক স্থানে হাদিসটি এসেছে, যেমন; সাহীহ বুখারি; জুমার সালাত অধ্যায়; হাদিস নম্বর ৮৯৩; নেতৃত্ব অধ্যায়; হাদিস নম্বর ১৮২৯ ]
[৬] [সুরা আত তাহরিম; আয়াত ৬]

[৭] উৎসঃ আত তাসিল ফি ত্বলবিল ইলম, মুহাম্মাদ বিন ‘উমার বিন সালিম বাযমূল, আল ইবানাহ ইবুকস কর্তৃক অনুদিত ও প্রকাশিত- ২০০৬