মূলঃ  কামাল আহমাদ 

সম্পাদনাঃ আবু হিশাম মুহাম্মাদ ফুয়াদ

 

একটি ফেসবুক পেইজে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে একটি ফাতওয়া পোস্ট করা হয়েছে। আমরা সেটার পর্যালোচনামূলক জবাব প্রদান করব:

~~~

করোনা ভাইরাসের আতংকে জুম’আ এবং জামাত ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে মৌরিতানিয়ার ওলামায়ে কেরাম ও মুফতিয়ানে ইজামের ফতোয়া।

লিখেছেন শায়খ আহমাদ আল-কাওরী (দাঃ)।(মৌরিতানিয়া)
(হুবহু বঙ্গানুবাদের চেষ্টা করা হয়েছে।)

 

প্রশ্নঃ- করোনা ভাইরাসের আতংকে সুস্থ সবল মুসলমানদের জুম’আ এবং জামাত ছেড়ে দেওয়া জায়েজ হবে কিনা?

 

উত্তরঃ-

 

====

প্রথমত – আল্লাহর রাস্তায় জেহাদের অবস্থায় নিশ্চিত শত্রুর মুখোমুখি থাকা অবস্থায়ও যখন জামাত ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নেই তখন সম্ভাব্য শত্রুর (করোনা ভাইরাসের) ভয়ে জামাত ছেড়ে দেওয়া কিভাবে জায়েজ হতে পারে?!

《وإذا كنت فيهم فأقمت لهم الصلاة فلتقم طائفة منهم معك…》الآية.

(এই আয়াতে “সালাতুল খাওফ” অর্থাৎ জেহাদের ময়দানে শত্রুর মুখোমুখি থাকাকালীন নামাজের ত্বরিকা বর্ণনা করা হয়েছে)

====

 

জবাব: জিহাদের ময়দানে দাবি হল, সিসাঢালা প্রাচীরের মত কাতারবন্দী হয়ে যুদ্ধ করা। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَانٌ مَّرْصُوصٌ

“আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন, যারা তাঁর পথে কাতারবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সীসাগালানো প্রাচীর।” [১]

 

পক্ষান্তরে মহামারী বা রোগব্যাধির ক্ষেত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) -এর নির্দেশনা হল:

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ‘’অসুস্থকে সুস্থদের সংস্পর্শে নেয়া উচিৎ নয়’’ [২]

আবু সালামাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি আবু হুরায়রাহ (রা.)-কে বলতে শুনেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ‘’কেউ যেন কখনো রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উটের সাথে না রাখে’’[৩]

আবু হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ ‘’রোগের কোনো সংক্রমন নেই, কুলক্ষন বলে কিছু নেই, পেঁচা অশুভের লক্ষন নয়, সফর মাসের কোনো অশুভ নেই। কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাকো, যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাকো’’[৪]

বুঝা যাচ্ছে, সলাত ও জিহাদের মিলেমিশে কাতারবদ্ধ হয়ে আমলটি করতে হয়। পক্ষান্তরে রোগব্যাধির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। দুটি নির্দেশ নিজ নিজ স্থানে হুবহু মানাটাই শরিআত। একটি আমল দিয়ে অপর আমলকে খণ্ডন করা শরিআত নয়। বরং ইলমের অপপ্রয়োগ।

 

====

দ্বিতীয়ত – এইসমস্ত রোগজীবাণু এবং ভাইরাস বিস্তারের মূল কারণ হলো গুনাহ এবং পাপাচার।

আল্লাহ জাল্লা শানুহূ বলেনঃ-

《وما أصابكم من مصيبة فبما كسبت أيديكم》.*

(তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল)

আল্লাহ জাল্লা শানুহূ আরো বলেনঃ-

《ظهر الفساد في البر والبحر بما كسبت أيدي الناس ليذيقهم بعض الذي عملوا لعلهم يرجعون》.*

(স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।)

আল্লাহ জাল্লা শানুহূ কি পরিস্কার ভাবে বলে দেননি যে,মুসিবত থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো তওবা,ইস্তেগফার,নামাজ,তেলাওয়াত এবং দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা?! আর জুম’আ,জামাত ইত্যাদি যেগুলো আমাদের উপর জরুরি করেছেন সেগুলির কিছু ছেড়ে না দেওয়া?!!

====

 

জবাব:  আল্লাহ তাআলা মানুষের পাপের কারণে যেভাবে আযাব বা শাস্তি পাঠান, তেমন কেবল তাঁর পক্ষ থেকেও পরীক্ষা করার জন্যও আযাব বা শাস্তি পাঠান। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ [٢:١٥٥] الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ [٢:١٥٦]

“অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।” [৫]

কাজেই এইভাবে প্রচার ভুল যে, কেবল মানুষের পাপের কারণেই আযাব আসে। বরং এটাও হতে পারে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা যে, তাঁর প্রেরিত রসূলের যথাযথ অনুসরণ মু’মিনরা করে কিনা। যেমন- আমরা পূর্বে জেনেছি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রোগ ব্যাধির সংক্রমণের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছেন। কিন্তু আমরা যদি সেই নির্দেশ না মানি তা হলে সেটা রসূলের দেখান পথ ও পদ্ধতির অবমাননা। জুমুআ ও জামাআত মানুষের সাধারণ কষ্টের ক্ষেত্রেও ত্যাগের অনুমতি আছে:

যেমন:

ক) শীত ও বৃষ্টির রাতে জামাআত ত্যাগ: সাহাবী ইবনু উমার (রা) থেকে বর্ণিত: “রসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আদেশ করতেন, যখন শীত ও বৃষ্টির রাত হয়, সে যেন বলে: “ শোন! নিজ নিজ অবস্থানে সলাত আদায় কর।”[৬]

খ) জুমুআ ত্যাগ: ইবনু আব্বাস (রা) তাঁর মুয়াযযিনকে এক প্রবল বর্ষণের দিনে বললেন, যখন তুমি (আযানে) ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ’ বলবে, তখন ‘হাইয়া আলাস্ সলাহ’ বলবে না, বলবে ‘সল্লু ফী বুয়ূতিকুম’ (তোমরা নিজ নিজ বাসগৃহে সলাত আদায় কর)। লোকেরা তা অপছন্দ করল। তখন তিনি (রা) বললেন: আমার চেয়ে উত্তম ব্যক্তিই (রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা করেছেন। জুমুআহ নিঃসন্দেহে জরুরি। আমি অপছন্দ করি তোমাদেরকে মাটি ও কাঁদার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করার অসুবিধায় ফেলতে। [৭]

গ) অনুরূপ মানবিক প্রয়োজন যেমন- খাওয়া উপস্থিত হলে জামাআত ত্যাগের অনুমতি রয়েছে।[৮]

পেশাব-পায়খানার বেগে সলাত তরক করার অনুমতি। [৯]

আর মহামারি যেন ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য রসূলের হাদীসের দাবি অনুযায়ী অসুস্থ ও সুস্থ মানুষের মিলন ক্ষেত্রগুলো এড়িয়ে চলাটাই মূল দাবি বা তাঁর নির্দেশ।

 

====

তৃতীয়ত – আল্লাহ জাল্লা শানুহূ বলেনঃ-

《ما أصاب من مصيبة في الأرض ولا في أنفسكم إلا في كتاب من قبل أن نبرأها》.

(পৃথিবীতে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর কোন বিপদ আসে না; কিন্তু তা জগত সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।)

তিনি আরো বলেন-

《قل لن يصيبنا إلا ما كتب الله لنا》.

(আপনি বলুন, আমাদের কাছে কিছুই পৌঁছবে না, কিন্তু যা আল্লাহ আমাদের জন্য রেখেছেন)

তিনি আরো বলেন-

《قل لو كنتم في بيوتكم لبرز الذي كتب عليهم القتل إلى مضاجعهم》.

আপনি বলুন, তোমরা যদি নিজেদের ঘরেও থাকতে তবুও তারা অবশ্যই বেরিয়ে আসত নিজেদের অবস্থান থেকে যাদের মৃত্যু লিখে দেয়া হয়েছে।)

হুজুরে আক্বদাস (সাঃ) বলেন,

(واعلم أن الأمة لواجمعت على أن ينفعوك لم ينفعوك إلا بشيء قد كتبه الله لك ولو اجتمعوا على أن يضروك لم يضروك إلا بشيء قد كتبه الله عليك) رواه أحمد والترمذي وقال حسن صحيح .

“জেনে রাখো সকল উম্মত যদি তোমার উপকারের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয় তবে ততটুকুই উপকার করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ জাল্লা শানুহূ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর যদি সকলে মিলে তোমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে তবে ততটুকুই ক্ষতিসাধন করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ জাল্লা শানুহূ তোমার ব্যাপারে লিপিবদ্ধ করেছেন।”(মুসনাদে আহমাদ,তিরমিজি)

====

 

জবাব:  এই আয়াত ও হাদীসগুলো তাক্বদীর ও তাওয়াক্কুলের হাদীস। এখানে আমাদের দায়িত্ব ঈমান রাখা ও আল্লাহর উপর নির্ভর করা। আর আমাদের করণীয় বিষয় সম্পর্কে নির্দেশনা নিম্নরূপ:

আনাস বিন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللهِ أَعْقِلُهَا وَأَتَوَكَّلُ أَوْ أُطْلِقُهَا وَأَتَوَكَّلُ قَالَ : اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ- ‘এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আমি কি তাকে (আমার উষ্ট্রীটাকে) বেঁধে রেখে (আল্লাহর উপর) ভরসা করব, না কি তাকে বন্ধনমুক্ত করে দিয়ে ভরসা করব? তিনি বললেন, আগে বেঁধে রাখো, তারপর ভরসা কর’।[১০]

এ পর্যায়ে আমরাও নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রোগব্যাধি সম্পর্কে যেভাবে দূরে থাকতে বলেছেন। মানবিক প্রয়োজনে জামাআতে না যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, সেগুলো পালনের সাথে সাথে তাওয়াক্কুলও করব, ইনশাআল্লাহ।

 

====

চতুর্থঃ- হুজুরে আক্বদাস (সাঃ) মহামারির সময়ের করণীয় কি; তা কি বলে দেননি?!তিনি কি একথা বলে দেননি যে, “মহামারি আক্রান্ত এলাকায় অন্যান্যদের প্রবেশ নিষেধ এবং আক্রান্ত এলাকাবাসীর এলাকা থেকে বাহির হওয়া নিষেধ?!!

সেখানে কি তিনি জামাত তরক করার কথা বলেছেন?!

====

 

জবাব:  আমরা পূর্বে এটাও জেনেছি যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুস্থদের সাথে অসুস্থদের মেলামেশা নিষেধ করেছেন। যা থেকে জামাআত তরক করার মানবিক প্রয়োজন সুস্পষ্ট হয়। কেননা মহামারি থেকে অনেক কম ক্ষতি যেমন –বৃষ্টি বা শীত, কিংবা পায়খানার বেগ, খাবার উপস্থিত হলেও জামাআত তরক করার অনুমতি স্বীকৃত।

 

====

পঞ্চমঃ- হজরত ওমর (রাজিঃ) এর জামানায় প্লেগ (মহামারি) দেখা দিলে তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রথমে মুহাজির সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করলেন তারপর আনসারদের সাথে তারপর মক্কা বিজয়ের সময় যারা মুসলমান হয়েছেন তাদের সাথে। তাদের কেউই কি মহামারির কারণে জামাত ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন?!!

====

 

জবাব:  উমার (রা) সাহাবীদের নিয়ে পরামর্শ করলে তারা বললেন:

আপনার লোকজনকে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করা এবং তাদের প্লেগের মধ্যে ঠেলে না দেয়াই আমরা ভাল মনে করি। তখন ‘উমার লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আমি ভোরে সাওয়ারীর পিঠে আরোহণ করব (ফিরার জন্য)। অতএব তোমরাও সকালে সওয়ারীর পিঠে আরোহণ করবে। …[১১]

বুঝা যাচ্ছে, উমার (রা) লোকদেরকে প্লেগের এলাকা থেকে দূরে রেখেছেন। তারা প্লেগমুক্ত এলাকায় ছিলেন। এজন্য জামাআত তরকের প্রয়োজন হয়নি। আমরাও তখন জামাআত তরকের কথা বলছি, যখন আমরা নিজেরাই মহামারি মধ্যে চলে গেছি।

অন্য হাদীসে অসুস্থতা জুমুআ ত্যাগ করার অন্যতম একটি কারণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
ত্বারিক্ব ইবনু শিহাব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
الْجُمُعَةُ حَقٌّ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ فِي جَمَاعَةٍ إِلَا أَرْبَعَةً عَبْدٌ مَمْلُوكٌ أَوِ امْرَأَةٌ أَوْ صَبِيٌّ أَوْ مَرِيضٌ

জুমুআ’র সলাত হক্ব – যা প্রত্যেক মুসলিমের উপর জামা‘আতের সাথে আদায় করা ফরয। তবে চার শ্রেণীর লোকের জন্য ফরয নয়ঃ ক্রীতদাস, নারী, শিশু ও রোগী। [১২]

আর মহামারিতে অসুস্থ লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় কেউ অসুখ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, অন্যদের মাঝে রোগ বিস্তার করে। এমন পরিস্থিতিতে জামাআত ও জুমুআ মাসজিদের দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে সীমিত রেখে, সর্বসাধারণকে ঘরে সলাত পড়ার নির্দেশ জারি করা সংগত হয়। কেননা যা মানুষের জন্য কষ্টকর এমন বিষয় নিয়ে মাসজিদের যাওয়া নিষেধ। কেননা তা মালাকদের জন্যও কষ্টকর। এ মর্মে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ أَكَلَ الْبَصَلَ وَالثُّومَ وَالْكُرَّاثَ، فَلاَ يَقْرَبَنَّ مَسْجِدَنَا فَإِنَّ الْمَلاَئِكَةَ تَتَأَذَّى مِمَّا يَتَأَذَّى مِنْهُ بَنُو آدَمَ
‘যে ব্যক্তি পেঁয়াজ, রসুন ও কুর্রাছ (গন্ধ সবজি) খাবে, সে যেন কখনই আমাদের মসজিদ পানে না আসে। কেননা বনী আদম যাতে কষ্ট পায় ফিরিশতারাও তাতে কষ্ট পায়’। [১৩]

এমনকি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে তাকে মাসজিদে থেকে বের করেও দেয়া হয়েছে। উমার (রা) জুমুআর খুতবাতে বলছিলেন: হে লোক সকল! তোমরা দু’টি গাছ খেয়ে থাক। আমি ঐ দু’টিকে কদর্য ছাড়া অন্য কিছু মনে করি না। সে দু’টি হচ্ছে পেঁয়াজ ও রসুন। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখেছি, إِذَا وَجَدَ رِيحَهُمَا مِنَ الرَّجُلِ فِى الْمَسْجِدِ أَمَرَ بِهِ فَأُخْرِجَ إِلَى الْبَقِيعِ   ‘কারো মুখ থেকে তিনি এ দু’টির গন্ধ পেলে তাকে মসজিদ থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিতেন। ফলে তাকে বাক্বী গোরস্থানের দিকে বের করে দেওয়া হ’ত। সুতরাং কাউকে তা খেতে হলে সে যেন পাকিয়ে খায়’। [১৪]

====

ষষ্ঠঃ- আল্লাহ জাল্লা শানুহূ বলেনঃ-

واستعينوا بالصبر والصلاة

(তোমরা ধৈর্য এবং নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো)

তো বর্তমান পরিস্থিতিতে মসজিদে জামাতের এহতেমাম করে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে যেমনটি হুজুরে আক্বদাস (সাঃ) করতেন, নাকি জুম’আ এবং জামাত ছেড়ে দিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে?!!

====

 

জবাব:  সবর ও সলাতের সাথেই আল্লাহর প্রার্থনা আমরাও করব। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তো বৃষ্টি ও শীতের মতো কারণ যা মহামারির মতো এত কঠিন নয়, সেক্ষেত্রে জুমুআ ও জামাআত ত্যাগ করার অনুমতি দিয়েছেন। সুতরাং মহামারি যা নিশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়, মোসাফাহর মাধ্যমে ছড়ায় তার থেকে দূরে থাকাটাই শরিআতের নির্দেশ।

 

====

সপ্তমঃ- হুজুরে আক্বদাস (সাঃ) বলেন,

من صلى الصبح في جماعة فهو في ذمة الله ..

(যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করলো সে আল্লাহর হেফাজতে)

আমাদের জন্য কি এইটা যথেষ্ট নয় যে আমরা আল্লাহর হেফাজতে হয়ে যাবো?!!

《أليس الله بكاف عبده》؟!!*

(আল্লাহ কি তাঁর বান্দার পক্ষে যথেষ্ট নন?)

====

 

জবাব:  রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এটাও বলেছেন: সুস্থকে অসুস্থের মাঝে মিশিয়ে ফেল না। এটাও তার নির্দেশ। যা সুনির্দিষ্ট বা খাস ঘটনার সাথে সম্পর্কিত। যেভাবে জামাআত বা জুমুআ তরকের বিষয়টিও খাস ঘটনার সাথে সম্পর্কিত।

 

====

অষ্টমঃ- যখন নাকি হুজুরে আক্বদাস (সাঃ) এক অন্ধ ব্যক্তিকে মসজিদ বা জামাত ছাড়ার অনুমতি দেননি তার এই কথা বলা সত্বেও যে “আমাকে রাস্তা দেখানোর মতো কেউ নেই” সেইসাথে মদিনায় বিষাক্ত কীটপতঙ্গ এবং হিংস্র পশুর উপদ্রব ও বেশি ছিল, তবে কিভাবে একজন সুস্থ সবল মুসলিমকে স্রেফ অসুস্থতার আশংকায় জামাত বা জুম’আ ত্যাগের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে?!!

====

 

জবাব: 

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে বৃষ্টি, শীতে বা মানবিক প্রয়োজনে সেটা ত্যাগের অনুমতি দিয়েছেন আমরা কি সেটা ভুলে যাব? অন্ধ ব্যক্তির উক্ত ঘটনাটি তখনকার জন্য প্রযোজ্য যখন বৃষ্টি, শীত বা মানবিক প্রয়োজনের বিষয়গুলো অনুপস্থিত থাকে।

অসুস্থতার চেয়ে অনেক কম ওজরের কারণেও মাসজিদে না যাওয়ার ও ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন, সাহাবী জাবির (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ أَكَلَ ثُومًا أَوْ بَصَلاً فَلْيَعْتَزِلْنَا، أَوْ قَالَ: فَلْيَعْتَزِلْ مَسْجِدَنَا ، وَلْيَقْعُدْ فِى بَيْتِهِ–
‘যে ব্যক্তি রসুন কিংবা পেঁয়াজ খাবে, সে যেন আমাদের থেকে দূরে থাকে। অথবা তিনি বলেছেন, সে যেন আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে এবং নিজ বাড়ীতে বসে থাকে’।” [১৫]

কাজেই মহামারির মতো সমস্যাতে উক্ত নির্দেশটি খুব সাধারণভাবে প্রয়োগযোগ্য ।

====

নবমঃ-হুজুরে আক্বদাস (সাঃ) যখনই কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতেন দ্রুত নামাজের দিকে ধাবিত হতেন।

তবে কি আমরা করোনা ভাইরাসের আতংকে জামাত এবং জুম’আ ছেড়ে দেব?!!

====

 

জবাব:  জি রসূলূল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবিক প্রয়োজনে আমাদেরকে তা তরকের অনুমতি দিয়েছেন।

 

====

দশমঃ- প্রাথমিক যুগে প্রত্যেক ইসলামি শহরে একটি করেই জামে মসজিদ ছিল।সেখানেই সবাই নামাজ আদায় করতেন।সেই সময় থেকেই তো প্লেগ মহামারি সংক্রামক ছিল এবং অপর মুসলিমকে সংক্রামিত করতো,তথাপি কোনো জামানার বরেণ্য ওলামায়ে-কেরাম কি প্লেগ কিম্বা মহামারীর কারনে মসজিদ সমূহে তালা লাগানোর ফতোয়া দিয়েছেন?!!

====

 

জবাব:  মাসজিদ বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। মাসজিদের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সেখানে জামাআতে সলাত পড়তে পারে। উদ্দেশ্যে যেন রোগির মাধ্যমে রোগ না ছাড়ায় কেননা, এটা একটা ভয়ভীতির ব্যাপার। আর ভয়-ভীতিও জামাআত তরক করার অন্যতম একটি ওজর বা অজুহাত। আমরা এ সম্পর্কে হানাফী ফাতওয়ার কিতাবে জামাআত তরক করার যেসব কারণ বর্ণিত হয়েছে, তা ‘ফাতাওয়া আলমগীরী থেকে তুলে ধরছি:

“সহীহ মতে অতি বৃষ্টি, কাদা, প্রচণ্ড শীত এবং প্রচণ্ড অন্ধকারের কারণেও জামাআতে হাযির হওয়ার আবশ্যকতা রহিত হয়ে যায়। অন্ধকার রজনীতে প্রবল বাতাস প্রবাহিত হওয়ার কারণেও এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। অবশ্য দিনের বাতাস ওজর হিসেবে স্বীকৃত নয়। এমনিভাবে পেশাব-পায়খানা বা এর কোন একটির প্রবল চাপ থাকা অবস্থায়ও জামাআতে হাযির হওয়ার আবশ্যকতা রহিত হয়ে যায়। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তির যদি এরূপ আশংকরা থাকে যে, সে জামাআতের উদ্দেশ্যে বের হলে পাওনাদার তাকে আটকিয়ে রাখবে। অথবা কেউ যদি সেফরের ইচ্ছা করে এবং এদিকে জামাআত দাঁড়িয়ে যায় এ অবস্থায় তার যদি আশংকা হয় যে, সে জামাআতে শরীক হলে কাফিলা তাকে ফেলে চলে যাবে, অথবা কেউ যদি রোগির খিদমতে থাকে অথবা মালের ক্ষতি হওয়ার যদি আশংকা থঅকে, তবে এরূপ ব্যক্তিদের জন্য জামাআত ত্যাগ করা জাইয আছে। এমনিভাবে বিকালের খানা উপস্থিত হওয়া অবস্থায় যদি সলাত আরম্ভ হয় এভং খানার প্রতি মনের চাহিদাও প্রবল থাকে, তবে জামাআত ত্যাগ করা জায়েয।…” [১৬]

পাদটীকা

[১] সূরা সফ – আয়াত  ৪
[২] ইবনু মাযাহ ৩৫৪১; আল আলবানি সহীহ বলেছেন।
[৩] বুখারী ৫৭৭১, ৫৭৭৪; মুসলিম ৫৫৯৭, ৫৫৯৮ (ই. ফা.) ;  আল লু’লু ওয়াল মারজান ১৪৩৬
[৪] বুখারী ৫৭০৭; মিশকাতুল মাসাবীহ ৪৫৭৭
[৫] সূরা বাক্বারা – আয়াত ১৫৫-১৫৬
[৬] বুখারী ৬৬৬, মুসলিম ১৪৭১ (ই. ফা.)
[৭] বুখারী ৯০১
[৮] বুখারী ৬৭৪, মুসলিম ১১২৪ (ই. ফা.)
[৯] মুসলিম ১১২৬ (ই. ফা.)
[১০] তিরমিযী ২৫১৭; আল আলবানি হাসান বলেছেন।
[১১] বুখারী ৫৭২৯
[১২] আবূ দাউদ ৯৪২, ১০৬৭
[১৩] মুসলিম ১১৩৪ (ই. ফা.)
[১৪] মুসলিম ১১৩৪ (ই. ফা.)
[১৫] মুসলিম ১১৩৪ (ই. ফা.)
[১৬] ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (ই. ফা.) ১ম খণ্ড ২১৩-২১৪ পৃ.