saheeh_namaz_e_nabawi

 

মূলঃ যুবায়ের আলী যাঈ
অনুবাদঃ আবু হিশাম মুহাম্মাদ ফুয়াদ

 

পূর্ব সতর্কীকরণঃ আরবি দু’আ বা যেকোনো পাঠের বাংলা উচ্চারণ কখনোই উচ্চারণের সঠিকত্বের ক্ষেত্রে তার সমকক্ষ হবার যোগ্যতা রাখে না। এখানে দেয়া হয়েছে শুধু বিশেষ অপারগতার শেষ সম্বল হিসেবে।

 

৮. এর পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা ফাতিহাহ পড়তেন। [1]
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (2) الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (3) مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (4) إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (5) اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (6) صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা ফাতিহা থেমে থেমে (ধীরস্থিরভাবে) তিলওয়াত করতেন এবং প্রতি আয়াত শেষে ওয়াকফ করতেন। [2] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لا صلوة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب
 “যে সালাতে সূরা আল ফাতিহা পড়লো না তার সালাত হলো না” (সহীহ আল বুখারিঃ ৭৫৬)
তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
كل صلواة لا يقرأ فيها بفاتحة الكتاب فهي خداج فهي خداج
“প্রত্যেক নামায যেখানে সূরা ফাতিহা পড়া হয় না তা অসম্পূর্ণ, তা অসম্পূর্ণ। * (ইবনে মাজাহ ৮৪১, সানাদ হাসান)
৯. অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমিন বলতেন। [3] সাইয়্যেদুনা ওয়ায়েল বিন হুজর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে নামায পড়লেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন। অতঃপর যখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ওয়ালাদ দ্বল্লীন’ (জোরে) বললেন তখন আমিন (জোরে) বললেন। [4]
এই হাদীস থেকে জানা গেলো যে, জেহরি** নামাযে ইমাম ও মুক্তাদিদের আমিন জোরে বলা উচিত।***
সাইয়্যেদুনা ওয়ায়েল বিন হুজর থেকে আরেক রেওয়াইয়াতে এসেছে,(وخفض بها صوته) “এবং তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার (আমিন) বলার সাথে আওয়াজ নিচু করলেন।” [5]
এই হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, সিররি নামাযসমূহে আমিন চুপে চুপে বলা উচিত। সিররি নামাযসহূহে আমিন চুপে চুপে বলার উপর মুসলমানদের ইজমা’ রয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।
১০. এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আরেক) সূরা পড়ার পূর্বে بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম) পড়তেন।  [6]
১১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “অতঃপর সূরা ফাতিহা পড় ও আল্লাহ যা চান পড়ো।” [7] নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম ২ রাক’আতে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পড়তেন। [8] এবং শেষ দুই রাক’আতে (শুধু) সূরা ফাতিহা পড়তেন। [9] তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিরাতের পর রুকুর পূর্বে সাকতা* করতেন। [10]
১২. এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকুর জন্য তাকবীর (অর্থাৎ আল্লাহু আকবার) বলতেন। [11]
১৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের দুই হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠতেন। [12] তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (রুকুর পূর্বে ও পরে) রফ’উল ইয়াদাইন করতেন এবং (তার পর) তাক্ববীর বলতেন। [13]
যদি প্রথমে তাক্ববীর ও পরে রফ’উল ইয়াদাইন করা হয় তবে তাও জায়েজ ও সঠিক হবে। আবু হুমাইদ আস সা’আদি রাযিআল্লাহু আনহু বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাক্ববীর বলতেন তারপর রফ’উল ইয়াদাইন করতেন।” [14]
১৪. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রুকু করতেন তখন নিজের হাত দুটো দ্বারা নিজের হাঁটু শক্ত করে ধরতেন। আতঃপর নিজের কমর ঝুঁকাতেন (এবং বরাবর সমান করতেন)। [15] তাঁর মাথা না তো (পিঠ থেকে) উঁচু হত এবং না তো নিচু হতো (বরং পিঠ বরাবর থাকতো)। [16]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের দুই হাতের তালু হাঁটুতে রাখতেন ও ই’তিদাল (মধ্যম ভাবে) সহিত রুকু করতেন, না মাথা খুব বেশি ঝুঁকাতেন না খুব বেশি তুলতেন বা উঁচু করতেন। [17] অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাথা মুবারাক একদম তাঁর পিঠ বরাবর থাকতো।
১৫. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকু করতেন তো নিজের দুই হাত এমনভাবে নিজের হাঁটুর উপর রাখতেন যেন কোনো কিছু ধরে আছেন (অর্থাৎ শক্ত করে ধরতেন) এবং দুই হাত কামানের বন্দুকের মতো তাক করে (সোজা করে) বগল থেকে দূরে রাখতেন। [18]
১৬. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকু তে  سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيْم (সুবহানা রব্বিয়াল ‘আযীম) পড়তে থাকতেন।  [19]
তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি (এই দু’আ) রুকুতে পড়বার হুকুম দিতেন। [20]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে রুকুতে এ দু’আ গুলোও প্রমাণিত –
 [21] سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْلِيْ
এই দু’আ টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক পরিমাণে পড়তেন।
[22] سُبُّوْحٌ قُدُّوْسٌ، رَبُّ الْمَلَا ءِكَةِ وَ الرُّوحِ
[23] سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ، لَا اِلَهَ اِلَّا اَنْتَ
[24] اَللَّهُمَّ لَكَ رَكْعَتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَلَكَ اَسْلَمْتُ، خَشَعَ لَكَ سَمْعِيْ وَبَصَرِي وَ مُخِّيْ وَعَظْمِيْ وَعَصَبِي
এই দু’আগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো দু’আই পড়া যায়। এই দু’আ গুলোকে একই রুকু বা সিজদায় জমা’ করা বা একত্র করে পড়া কোনো স্পষ্ট দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে তাশাহুদের হালাতের “অতঃপর তার যে দু’আ পছন্দ হয় তা সে পড়বে” (আল বুখারিঃ ৮৩৫, মুসলিমঃ ৪০৩) – এই আম দলিলে দ্বারা এই দু’আগুলো জমা’ বা একত্র করা জায়েজ। ওয়াল্লাহু আ’লাম।

পাদটীকা

[1] আন নাসাঈঃ ৯০৬; সানাদ সহীহ, আরো দেখুনঃ পূর্বের টিকাঃ৩
সূরা ফাতিহা’র অর্থঃ (১) যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক (২) যিনি করুণাময় কৃপানিধান (৩) যিনি বিচার দিবসের মালিক (৪) আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং একমাত্র আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি (৫) আপনি আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন! (৬) এমন লোকদের পথ, যাদেরকে আপনি পুরষ্কৃত করেছেন (৭) তাদের পথ নয়, যারা অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট হয়েছে।
[2] আবু দাউদঃ ৪০০১; আত তিরমিযীঃ ২৯২৭, তিনি গরিব বলেছেন। হাকেম সহীহ বলেছেন শাইখায়নের শর্তে (২/২৩৩) – যাহাবী সহমত প্রকাশ করেছেন। এর সানাদ দ্বইফ হলেও এর শক্তিশালী শাহেদ রয়েছে মুসনাদে আহমাদ (৬/২৭৭) এ, হা/৬৭০০; এর সানাদ হাসান। এবং হাদীস টি হাসান।
[*] হাদীস টির মূল পাঠে এসেছে “خداج” এর আসল অর্থ উটের গর্ভপাত হতে  জন্ম দেয়া অসমাপ্ত সন্তান। যার ভাবার্থ হলো অসম্পূর্ণ, যেটি লেখক রহিমাহুল্লাহ করেছেন- অনুবাদক। সূত্রঃ http://-www.almaany.com/ar/¬dict/ar-ar/خِدَاجٌ/
[3] আন নাসাঈঃ ৯০৬; সানাদ সহীহ। বিস্তারিত দেখুনঃ উক্তিঃ ৭ টিকাঃ ৬
[4] ইবনে হিব্বানঃ আল ইহসানঃ ১৭০২; সানাদ সহীহ।
[**] যে সকল সালাতে জোরে কিরাআত করা হয় তাদের জেহরি সালাত ও যেসব সালাতে কিরাআত চুপে চুপে করা হয় তাদের সিররি সালাত বলে-অনুবাদক
[***] এক বর্ণনায় এসেছে,“فجهر بآمين”   “অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমিন জোরে বললেন।” আবু দাউদঃ ৯৩৩; সানাদ হাসান  [5] আহমাদ ৪/৩১৬, হা/১০৯৮। আর বর্ণনাকারীরা সীক্বাহ এবং ইমাম বুখারি ও অন্য ইমামরা তাকে উচ্চ করেছেন।
[6] মুসলিমঃ৪১১- قال رسول الله صلله عليه و سلم
“أنزلت علي آنفاً سورة، فقرأ بسم الله الرحمن الرحيم إنا أعطيناك الكوثر فصل لربك وانحر إن شانءك هو الأبتر”
সাইয়্যেদুনা মু’আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার সূরা ফাতিহা পড়ার পর অন্য সূরা পড়ার পূর্বর  بسم الله الرحمن الرحيم (বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম) পড়েন না। ফলে মুহাজির ও আনসার (সাহাবী) রা খুব নারাজ হয়েছিলেন। এর পর থেকে মু’আবিইয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু সূরা পড়ার পূর্বে তা পড়তেন। শাফেঈ বর্ণনা করেছেন (আল আমঃ ১/১০৮) হাকেম সহীহ বলেছেন মুসলিমের শর্তে (২/২০৩)- যাহাবী সহমত পোষণ করেছেন।– এর সানাদ হাসান।
 [7] আবু দাউদঃ ৮৫৯; সানাদ হাসান।
[8] বুখারিঃ ৭৬২; মুসলিমঃ ৪৫১
[9] বুখারিঃ৭৭৬; মুসলিমঃ৪৫১
[10] আবু দাউদঃ ৭৭৭, ৭৭৮; ইবনে মাজাহঃ ৮৪৫। ও এ হাদীস সহীহ/ হাসান বাসরী মুদাল্লিস (ত্ববাকাতুল মুদাল্লিসিন বি তাহক্বীকীঃ ২/৪০)। তবে তার সামারাহ বিন জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীস সহীহ হয় যদি তাসরীহ সামা’ নাও হয়। বিস্তারিত দেখুনঃ নায়লুল মাক্বসুদ ফিত তা’লিক্বি ‘আলা সুনানি আবি দাউদঃ ৩৫৪
[11] আল বুখারিঃ ৭৮৯; মুসলিমঃ ৩৯২
[12] আল বুখারিঃ ৭৩৮; মুসলিমঃ ৩৯০
[13] মুসলিমঃ ৩৯০
[14] আবু দাউদঃ ৭৩০, সানাদ সহীহ। বিস্তারিত দেখুন, উক্তিঃ ১ টিকাঃ ১।
[15] আল বুখারিঃ ৮২৮
[16] মুসলিমঃ ৪৯৮
[17] আবু দাউদঃ ৭৩০; সানাদ সহীহ
[18] আবু দাউদঃ ৭৩৪; সানাদ হাসান। এবং তিরমিযী বলেন (২৬০) “ হাদিছটি হাসান সহীহ” ও সহীহ বলেছেন ইবনে
খুযাইমাহ (৬৮৯) এবং ইবনে হিব্বানঃ আল ইহসানঃ ১৮৬৮
সতর্কীকরণঃ ফুলাইহ বিন সুলাইমান সহীহাইয়নের রাওয়ী এবং হাসানুল হাদীস। অধিকাংশ মুহাদ্দিস তার তাউসিক্ব করেছেন অর্থাৎ তাকে সহীহ বলেছেন। অতঃএব এ রেওয়াইয়াত হাসান লি যাতিহী। এই ফুলাইহ এর উপর জারাহ মারদুদ বা প্রত্যাখ্যাত। আলহামদুলিল্লাহ ।
[19] মুসলিমঃ ৭৭২। এর শব্দগুলোঃ “ثم ركع فجعل يقول: سبحان ربي العظيم، فكان ركوعه نحواً من قيامه”
[20] আবু দাউদঃ ৮৬৯; সানাদ সহীহ। ইবনে মাজাহঃ ৮৮৭। সহীহ বলেছেন ইবনে খুযাইমাহঃ ৬০১, ৬৭০, ও ইবনে হিব্বানঃ আল ইহসানঃ ৮৯৬। এবং আল হাকিমঃ ১/২২৫, ২/৪৭৭। মায়মূন বিন মেহরান (তাবি’ঈ) এবং যাহিরি (তাবি’ঈ) বলেন, “রুকু’ ও সিজদায় তিন তাসবিহ এর কম পড়া উচিত নয়।” (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহঃ ১/২৫০; হা/২৫৭১; সানাদ হাসান)
[21] আল বুখারিঃ ৭৯৪,৮১৭; মুসলিমঃ ৪৮৪
[22] মুসলিমঃ ৪৮৭
[23] মুসলিমঃ ৪৮৫
[24] মুসলিমঃ ৭৭১
[25]মূলঃ সাহীহ নামাযে নাবাওয়ী; হাদইয়াতুল মুসলিমিন নামায কি এহেম মাসাইয়েল মা’আ মুকাম্মাল নামাযে নাবাওয়ী, যুবাঈর আলি যাঈ,পৃষ্ঠা ১০৭-১১০, www.kitabosunnat.com
স্বত্বাধিকারী © www.darhadith.com। অন্য কোন ওয়েব সাইটে কপি করলে অবশ্যই আমাদের লিঙ্ক দেবেন।