মূল বইঃ শাইখ আব্দুর রাহমান বিন নাসির আস সা’দি
ব্যাখ্যাঃ আবুল হারিথ বিন সা’য়িদ আত তা’মিরি
অনুবাদঃ আবু হাযম মুহাম্মাদ সাকিব চৌধুরী বিন শামস আদ দীন আশ শাতকানী।

 

 

الإضافية(আল ইদাফিয়্যাহ, সম্পৃক্ততা) (পরিশিষ্ট অংশ) ঃ 

 

الفقه (আল ফিকহ) ভাষাগতভাবেঃ এটি الفهم (আলফাহম, বুঝ), যা জ্ঞানের ব্যপারে সাধারণীকৃত। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণীঃ

قَالُواْ يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيرًا مِّمَّا تَقُولُ
তারা বলল, ও শু’আইব, তুমি যা বল, তার অধিকাংশই আমরা বুঝি না। (১১ঃ৯১)

فَمَا لِهَؤُلاء الْقَوْمِ لاَ يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا
সুতরাং এ কাওমের কি ব্যপার যে তারা যেন কোন কথা বুঝতেই চায় না? (৪ঃ৭৮)

وَلَكِن لاَّ تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ
কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ (সুপ্রশংসা) বুঝতে পার না। (১৭ঃ৪৪)

وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي
এবং আমার জিহ্বা হতে গিট খুলে দিন।

يَفْقَهُوا قَوْلِي
যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। (২০ঃ২৭-২৮)

এবং এর মধ্যে রয়েছে নবী ﷺ এর বক্তব্যঃ

من يرد الله به خيرا يفققه في الدين
আল্লাহ যার কল্যাণ কামনা করেন, তাকে দীনের বুঝ দান করেন। (বুখারী ৭১, মুসলিম ১০৩৭)

 

الفقه (আল ফিকহ) ইসতিলাহিগতভাবেঃ তা হচ্ছেঃ

معرفة الأحكام الشرعية العملية المكتسبة من الأدلتها التفصيلية

শারীয়ার আমল সংক্রান্ত হুকুমসমূহের বুঝ যা অর্জনকৃত এর বিস্তারিত দলিল হতে।

 

معرفة (আল মা’রিফাহ, বুঝ) এ সংশ্লিষ্ট العلم (আল ইলম, জ্ঞান) এবং الظن الراجح (আধ ধান্ন আর রাজিহ, অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ধারণা)। সুতরাং শারীয়াতের আহকামের বুঝ কখনো হয় يقيني (ইয়াকিনি, বিশ্বাসগত), আর কখনো হয় ظني (ধান্নি, ধারণাগত), যা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী মতের উপর, যার সাথে থাকে দুর্বল মতের অস্তিত্বের সম্ভাবনা, যেভাবে অনেক ফিকহি মাসআলাতে রয়েছে।

 

الأحكام الشرعية (আল আহকাম আশ শার’ইয়িয়্যাহ, শারীয়াতের হুকুম সমূহ) তা হচ্ছে যা শারীয়াতে প্রমাণিত। সুতরাং এ সংজ্ঞায় প্রবেশ করেনি আক্কেলজনিত আহকাম, যেমন এক দুইয়ের অর্ধেক। আবার প্রবেশ করেনি অনুভবগত আহকাম, যেমন আগুন দাহ্যকারী। অথবা ওয়াদয়ী আহকাম (الودعية), যেমন এ বুঝ যে فاعل (ফা’ইল, কর্মসম্পাদনকারী) সবসময় مرفوع (মারফু’)। অথবা পরীক্ষায় প্রমাণকারী আহকামসমূহ, যেমন বিষ হত্যাকারী।

 

العملية (আল ‘আমালিয়্যাহ, কর্মসংক্রান্ত) যেমন সালাত, যাকাত, বিক্রয় ইত্যাদি। সুতরাং এ থেকে বার হয়ে গিয়েছে (কিছু) আমলসংক্রান্ত বিষয়সমূহ, যেমন তাওহীদ, আখলাক সংক্রান্ত মাস’আলা যেমন সত্যবাদিতা ওয়াজিব হওয়া, আমানত রক্ষা করা, ইত্যাদি। সুতরাং এ সকলকে উসুলীগণের ইস্তিলাহে ফিকহ বলা হয় না।

(শাইখ আবুল হারিথঃ হাদিস আর সালাফ আস সালেহদের ভাষায় আরও বিস্তৃত এবং সংশ্লিষ্ট, সুতরাং তাদের নিকট ফিকহ হচ্ছে সাধারণভাবে জ্ঞান এবং আল্লাহর দীনের ব্যপারে মা’রিফাহ।

ইমাম সালেহ আল ফাল্লানী বলেন, সালাফদের মতে ফাকিহ নামটি … বিশেষ করে তার ব্যপারে প্রযোজ্য যে জ্ঞান রাখে আল্লাহর কিতাব, আস সুন্নাহ, সাহাবীদের আথার এবং তাদের উম্মতে পরবর্তী উলামাদের সম্পর্কে। আর সে ব্যক্তি যে ব্যস্ত থাকে মানুষের মত নিয়ে আর তাকেই দীন ও মাযহাব স্বরূপ গ্রহন করে এবং সে ছুঁড়ে ফেলে আল্লাহর কিতাব আর রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাত, সাহাবীদের বিচারকার্য, তাবি’ঈ এবং তাদের আথার সমূহকে তার পেছনে, তবে তাকে সাধারণভাবে ফাকিহ নামটি দেওয়া হয় না, বরং মূলত তাকে নামকরণ করা হয় মনানুসরণ আর অন্ধ অনুসরণ দিয়ে।

(إيقاظ همم أولي الأبصار, সালেহ বিন মুহাম্মাদ বিন নুহ আল ফাল্লানী, পৃষ্ঠা ২৮)

শাইখ ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়্যাহ বলেন,

বরং সালাফেরা ফিকহ শব্দটিকে কখনোই ব্যবহার করতেন না যতক্ষণ না তা আমলের সাথে সংশ্লিষ্ট হত। যেমন, সা’দ ইবনু ইব্রাহীম কে জিজ্ঞেস করা হল মদিনার সবচাইতে বড় ফিকহ সম্পন্ন ব্যক্তি সম্পর্কে। তিনি বললেন, তাঁদের মধ্যে সবচাইতে আল্লাহভীরু যিনি।

(مفتاح دار السعادة, ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়্যাহ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১৯)

আর তাই এ বিষয়টি ইবনুল জাওযী যেভাবে বলেছেন,

আগের দিনের ফুকাহাবৃন্দ ছিলেন আহলে কুরআন আর হাদিস।

(تلبيس إبليس – منتقاء النفيس للحلبي, ইবনুল জাওযী, পৃষ্ঠা ১২৭)

আমি বলি, উপরের বিষয়টির সাথে একমত হবার আলোকে এ বিষয়ে সকল কিছুকে বুঝা হয় আল্লাহর বক্তব্যে,

وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُواْ كَافَّةً فَلَوْلاَ نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُواْ فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُواْ قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُواْ إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ

আর এটি বিশ্বাসীদের জন্যে সমীচিন নয় যে তারা সকলে (যুদ্ধে) বেড়িয়ে পড়বে। এমনটি কেন হয় না যে প্রত্যেক দল হতে একটি তা’য়িফাহ বেড়িয়ে পরবে দীনের বুঝ অনুসন্ধান করতে এবং তাদের কাওমদের সাবধান করতে যখন তারা ফেরত আসে তাদের নিকট যাতে তারা সাবধান হয়। (৯ঃ১২২)

لَهُمْ قُلُوبٌ لاَّ يَفْقَهُونَ بِهَا
তাদের অন্তর রয়েছে, যা দিয়ে তারা বুঝতে পারে না। (৭ঃ১৭৯)

قَدْ فَصَّلْنَا الآيَاتِ لِقَوْمٍ يَفْقَهُونَ
নিশ্চয়ই আমি ব্যাখ্যা করেছি আয়াতকে সে জাতির জন্যে যারা বুঝে। (৬ঃ৯৮)

এভাবেই বুঝা হয় নবী ﷺ এর বক্তব্যঃ

من يرد الله به خيرا يفققه في الدين
আল্লাহ যার কল্যাণ কামনা করেন, তাকে দীনের বুঝ দান করেন। (বুখারী ৭১, মুসলিম ১০৩৭)

আর আমাদের ইমাম আস সা’দি, আল্লাহ রহম করুন তার উপর, যিনি “আল্লাহ যার সম্পর্কে উত্তম ইচ্ছা করেন, তাকে তিনি দীনের ফিকহ দান করেন” হাদিসের মর্ম উপলব্ধি করে বলেন,

আর দীনের ফিকহে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে উসুল উল ঈমান, ইসলামের শারীয়াত এবং হুকুমসমূহ, ইহসানের হাকিকত, সুতরাং দীনের মধ্যে এ তিনটির প্রত্যেকটি রয়েছে। যেভাবে জিবরীলের হাদিসে এসেছে, যখন তিনি নবী ﷺ কে জিজ্ঞেস করলেন ইসলাম, ঈমান এবং ইহসান সম্পর্কে, আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম জবাব দেন এদের সংজ্ঞা দেবার মাধ্যমে। তখন তিনি ঈমানকে বর্ণনা দিলেন এর ছয়টি উসুল দিয়ে, ইসলামকে বর্ণনা দিলেন এর পাঁচটি কায়িদা দিয়ে, আর ইহসানের বর্ণনা দিলেন এভাবে,

ان تعبد الله كأنك تراه, و إن لم تكن تراه, فإنه يراك

আপনি আল্লাহকে ইবাদাত করবেন এমন করে যেন আপনি তাঁকে দেখতে পান, আর যদিও আপনি তাঁকে দেখতে না পান, নিশ্চয়ই তিনি আপনাকে দেখতে পারছেন।

সুতরাং এতে প্রবেশ করেছে আকিদাহ, সালাফদের মাযহাব সম্পর্কে বুঝ এবং এতে বাহ্যিক এবং আন্তরিকভাবে একমত হওয়া, বিরোধীদের মাযহাব এবং কিতাব ও সুন্নাহর বিরোধিতাকারীদের ব্যপারে বর্ণনা সমূহ সম্পর্কে জ্ঞান। এবং এতে প্রবেশ করেছেঃ ফিকহের জ্ঞান – উসুল ও শাখাপ্রশাখা, ইবাদাতের হুকুম সমূহ, মু’আমালাতের হুকুম সমূহ, অপরাধ জনিত বিষয়াদি ইত্যাদি। এবং এতে রয়েছে ঈমানের হাকিকতের ব্যপারে বুঝ, আল্লাহর কিতাব এবং সুন্নাহ নির্দেশিত পথ এবং সে অনুযায়ী চলা।

এমনিভাবে এতে প্রবেশ করেছে সে সকল পথে জ্ঞানার্জন করা যা দীনের ফিকহ বুঝতে সাহায্য করে, যেমন আরবী ভাষাজ্ঞান এবং এর শাখাপ্রশাখা সমূহ।

সুতরাং যার আল্লাহ কল্যাণ করতে চান, তিনি তাকে এ সকল বিষয়ে ফিকহ বা বুঝ দান করেন, এবং এ বিষয়ে তাওফীক দান করেন।

এবং এই হাদিসের ফিকহ এই নির্দেশ করে যে এ সকল জ্ঞান হতে সম্পূর্ণরূপে বিমূখ হয়, সে ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই আল্লাহ তার ব্যপারে কল্যাণ চান নি, নিশ্চিতভাবে তাকে বঞ্চিত করেছেন সে সকল উপায় হতে যা দিয়ে কল্যাণ অর্জন করা যায় ও যার দ্বারা আনন্দ তথা সাফল্য অর্জন করা যায়।

(بهجة قلوب الأبرار, আব্দুর রাহমান বিন নাসির আস সা’দি, পৃষ্ঠা ২৫)

)

 

المكتسبة (আল মুকতাসাবাহ, অর্জনকৃত) অর্থাৎ, تفصيلي (তাফসিলি, বিস্তারিত) দলিল হতে অর্জনকৃত ফাইদা যা গবেষণা এবং দলিলানুসন্ধানের পথে লব্ধ। সুতরাং এ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে আল্লাহ সুবহানুহু ওয়া তা’আলার জ্ঞান। আর তেমনিভাবে মুকাল্লিদের জ্ঞান এবং তার মা’রিফাহ। সুতরাং এর প্রাপ্তি গবেষণা এবং দলিলানুসন্ধানে।

 

الأدلتها التفصيلية (আদিল্লাতুহা আত তাফসিলিয়্যাহ, এর বিস্তারিত দলিল হতে) অর্থাৎ, আংশিকভাবে (جزئية, আংশিক) ফিকহের দলিল যা কোন নির্দিষ্ট মাস’আলার হুকুমের সাথে সংযোজিত। আর এভাবে উসুলুল ফিকহ বেরিয়ে গিয়েছে, কেননা এটি সাধারণ দলিলের (إجمالية) সাথে সম্পর্কযুক্ত, বিস্তারিতের সাথে নয়।

আর তাফসিলি বা বিস্তারিত দলিলের উদাহরন আল্লাহর বাণী,

وَلاَ تَقْرَبُواْ الزِّنَى

এবং তোমরা যিনার সন্নিকটে এসো না। (১৭ঃ৩২)

সুতরাং এটি جزئ (জুয’য়ি, আংশিক) দলিলের উদাহরণ যাতে একটি বিশেষ মাস’আলার বিষয়টি খাস করা হয়েছে, আর তা হচ্ছে যিনা।

সুতরাং ফাকিহ অনুসন্ধান করেন হয় তাফসিলি জুয’য়ি (বা আংশিক বিস্তারিত) দলিল হতে, যাতে কোন বিশেষ পরিসীমার মধ্যে থাকা মাস’আলার হুকুম অনুসন্ধান করা যায়, আর তা إجمالي(ইজমালী) বা সাধারণ দলিল হতে (অনুবাদকঃ অর্থাৎ উসুলুল ফিকহ হতে), সুতরাং তা হচ্ছে, (শাইখ ইবনু তাইমিয়্যাহ এর ভাষায় ফাকিহ এমন যেন তিনি)

কোন বিশেষ দলিলে বক্তব্য রাখেন, কোন বিশেষ হুকুমের ব্যপারে (مجموع الفتاوى, তাকি উদ্দিন ইবনু তাইমিয়্যাহ, খন্ড ১৩, পৃষ্ঠা ১১৯),

যেখানে একজন উসুলি ইজমালি দলিলের অনুসন্ধান করেন যেক্ষেত্রে এর ইঙ্গিত শারিয়াতের আহকামের দলিলের উপর জুযয়ি দলিল হতে, যাতে এর (অনুবাদকঃ অর্থাৎ ইজমালি দলিলের) প্রয়োগ করেন একজন ফাকিহ জুযয়ি দলিলের উপর যাতে তিনি শারীয়াতের আহকাম বাহির করতে পারেন।

(চলবে)