মূলঃ শাইখ আব্দুর রাহমান বিন নাসির আস সা’দি
তা’লীক্কঃ আব্দুল্লাহ বিন যা’ল আল ‘ইনযী
অনুবাদঃ আবু হাযম মুহাম্মাদ সাকিব চৌধুরী বিন শামস আদ দীন আশ শাতকানী

 

 

كتاب الطهارة – পবিত্রতা অধ্যায়

فصل في المياه – পানি বিষয়ক পাঠ

 

৬। সালাতের বিষয়েঃ এতে কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে, এর মধ্যে রয়েছেঃ

৭। طهارة (তাহারাহ) বা পবিত্রতাঃ যেভাবে নবীﷺ বলেছেন,

لا يقبل الله صلاة بغير طهور

আল্লাহ তাহারাহ অর্জন ব্যতীত সালাত কবুল করেননা।[১] সুতরাং যে বড় হাদাস (অর্থাৎ মলত্যাগ, ইত্যাদি), ছোট হাদাস (মূত্র ত্যাগ, ইত্যাদি)[২], নাজাসাহ[৩] হতে পবিত্রতা অর্জন না করবে, তার জন্যে কোন সালাত নেই।

৮। তাহারাহ দুই প্রকারঃ

৯। তাদের একটিঃ পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা। আর এটিই হচ্ছে (পবিত্রতার) মূল।[৪]

১০।সুতরাং সকল পানি যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় অথবা মাটি থেকে নির্গত হয়, তা পবিত্র, [৫] যা হাদাস এবং খারাপ বিষয় সমূহ হতে পবিত্র করে; এমনকি যদিও এর রং বা স্বাদ বা গন্ধ পরিবর্তিত হয়ে যায় কোন পবিত্র কিছু দ্বারা।[৬] যেভাবে নবীﷺ বলেছেন,

إن الماء طهور لا ينجسه شيء

পানি পবিত্র, একে কোন কিছু নাজাস বা অপবিত্র করেনা। একে সুনান বর্ণনাকারীরা উল্লেখ করেছেন, আর তা সাহীহ। [৭]

১১।যদি এর গুনসমূহের কোন একটি নাজাসাতের দ্বারা পরিবর্তীত হয়, তবে তা নাজাস বা অপবিত্র। একে পরিত্যাগ করাই ওয়াজিব।[৮]

১২। আর যে কোন বিষয়ের মূল হচ্ছে পবিত্রতা এবং তা মুবাহ হওয়া।[৯]

১৩। সুতরাং যদি কোন মুসলিম কোন পানির নাজাসাতের ব্যপারে সন্দেহ করে; অথবা কাপড়ের ব্যপারে, অথবা কোন দাগের ব্যপারে, অথবা অন্য কিছুর ব্যপারেঃ তবে তা পবিত্র। অথবা সে বিশ্বাস করবে যে তা পবিত্র। আর যদি সে সন্দেহ করে কোন প্রকার হাদাসের ব্যপারে, তবে তা পবিত্র। কেননা নবীﷺ বলেছেন সেই ব্যক্তির ব্যপারে যার এই ধারণা আসে যে সে সালাতের মধ্যে কিছু পেয়েছে (অর্থাত হাদাস হতে),

لا ينصرف حتى يسمع صوتا او يجد ريحا

সে পরিত্যাগ করবেনা যতক্ষণ না (হাদাসের) শব্দ শুনতে পাবে বা গন্ধ পাবে। (মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি)[১০]

 

 

 

পাদটীকা

 

[১] মুসলিম (৬৬৪), উমার ইবনুল খাত্তাবের হাদিস হতে। আর যে হাদিসে এই হাদিসের সাথে ভাষা একই, তা হচ্ছে, আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে যিনি নবীﷺ হতে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেন,

لا يقبل الله صلاة احدكم إذا احدث حتى يتوضأ

তোমাদের কারো সালাত আল্লাহ গ্রহন করবেন না যদি তোমরা حدث (হাদাস, অর্থাৎ বায়ু ত্যাগ, মল-মূত্র নির্গমন ইত্যাদি) কর, যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমরা অজু কর। (বুখারী ৬৯৫৪, মুসলিম ২২৫)

[২] حدث বা হাদাস, অর্থাৎ বায়ু ত্যাগ, মল-মূত্র নির্গমন ইত্যাদি

[৩] نجاسة (নাজাসাহ, অর্থাৎ অপবিত্র। ) বলতে এ ক্ষেত্রে শারিয়াতের পরিভাষায় অপবিত্র বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ শারিয়াতের দৃষ্টিকোণ হতে যা অপবিত্র বলে গণ্য।

[৪] কেননা আল্লাহর বাণীঃ

وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُم مِّن السَّمَاء مَاء لِّيُطَهِّرَكُم بِهِ

এবং আকাশ হতে তোমাদের উপর পানি বর্ষণ করা হয় যাতে এর দ্বারা তোমরা পবিত্রতা অর্জন করতে পার। (৮ঃ১১)

এবং আল্লাহ তা’আলার বাণীঃ

فَلَمْ تَجِدُواْ مَاء فَتَيَمَّمُواْ

…যদি তোমরা পানি না পাও তবে তায়াম্মুম কর … (৫ঃ৬)

[৫] কেননা আল্লাহর বাণীঃ

وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَاء مَاء طَهُورًا

… এবং আকাশ থেকে বর্ষণ করেছেন পবিত্র পানি।

[৬] কেননা আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর তাঁর বাবা রিদওয়ানুল্লাহি আলাইহিমা হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমরা আল্লাহর রাসূলﷺ এর সাথে বাহির হলাম উহুদ পাহাড়ে উঠলাম। তিনি বললেন, এর পর আল্লাহর রাসূলﷺ আদেশ করলে আলী ইবনু আবি তালিব কে, এর পর (পানি পান করবার জন্যে) ধাতব পাত্র নিয়ে এলেন। তিনি তাঁর চামড়ার বর্মে করে পানি নিয়ে এলেন। এর পর আল্লাহর রাসূলﷺ তা হতে পান করবার ইচ্ছা পোষণ করলেন, কিন্তু এতে তিনি (অপছন্দনীয়) গন্ধ পেলেন। সুতরাং তিনি এতে বিতৃষ্ণা বোধ করলেন। এর পর তিনি তা দ্বারা আপন মুখে যে রক্ত ছিল তা ধুয়ে নিলেন… (ইবনু হিব্বান খন্ড ১৫/৪৩৬, আল বায়হাকী খন্ড ১/৪০৫)

আল বাউসীরী বলেছেন ইতহাফ আল মিহরাহ গ্রন্থে (খন্ড ৫/৮২)ঃ এই ইসনাদটি সাহীহ।

ইসহাক বলেছেন, সুতরাং এতে এই বর্ণনা এবং দিকনির্দেশনা রয়েছে যে তা পবিত্র; আর যদি তা এরূপ না হতো, তবে নবীﷺ এর দ্বারা রক্ত ধৌত করতেন না। (আল আওসাত লি ইবনুল মুনযির, ১/৬২০)

[৭] আহমাদ ৩/৮৬, আবু দাউদ ৬৬ ও ৬৭, আত তিরমিযী ৬৬, আন নাসায়ী ১/১৭৪, আদ দারাকুতনী ১/২৯, আল বায়হাকী ১/৩৮৯, যা আবু সা’ঈদ আল খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদিস হতে।

আত তিরমিযী বলেন, হাসান হাদিস, এর মর্যাদা উত্তোলন করেছেন আবু উসামাহ।

আন নাওয়াওয়ী বলেছেন আল মাজমু’ গ্রন্থে (১/১৪)ঃ সাহীহ হাদিস।

আল হাফিয (ইবনু হাজার আল আসকালানী) বলেছেন আত তালখীস আল হাবীর গ্রন্থে ১/২৪ঃ একে আহমাদ বিন হানবাল সাহীহ বলেছেন। (একে) আরও সাহীহ বলেছেন ইয়াহইয়া বিন মা’ঈন ও আবু মুহাম্মাদ ইবনু হাযম। আল আলবানী একে সাহীহ বলেছেন আল ইরওয়া গ্রন্থে ১/৪৫।

[৮] ইবনুল মুনযীর বলেছেন, উলামাবৃন্দ ইজমা’ করেছেন যে,  এ পানি যদি খুব স্বল্প পরিমাণ বা অধিক পরিমাণ হয়, আর তাতে নাজাসাহ আপতিত হয়, এর পর এই নাজাসাহ পানিকে পরিবর্তন করে ফেলেঃ অর্থাৎ স্বাদ, রং ও গন্ধকে; তবে সে ক্ষেত্রে এটি নাজাস বা অপবিত্র, যতক্ষণ এরূপ থাকবে। এ পানি দ্বারা অজু করা জায়েয নয়, গোসল করাও জায়েয নয়। (আল আওসাত ১/২৬০)। আরও পড়ুনঃ আল মাজমু’ ১/৩৬, ও আল মুগনী ১/৩৮।

[৯] আল্লাহর ‘আম (General) বক্তব্যের কারণেঃ

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الأَرْضِ جَمِيعًا

তিনিই সে যিনি সৃষ্টি করেছেন পৃথিবীর সমস্তকিছু তোমাদের জন্যে। (২ঃ২৯)

আশ শাওকানী বলেছেন, এই আয়াতের মধ্যেই এ দলীল রয়েছে যেঃ সে সকল কিছু যা কিছুর ব্যপারে نص (নাস্ব, অর্থাৎ আল কুরআন এবং আস সুন্নাহ হতে বাণী) রদ করেনি অথবা দু চোখে দৃশ্যমান কোন কিছু যা পৃথিবীতে বিদ্যমান, সে সকল কিছুর আসল বা মূল হচ্ছে হালাল হওয়া, যতক্ষণ না পর্যন্ত কোন দলীল এর হারাম হওয়ার ব্যপারে নির্দেশনা দেবে। ফাতহুল কাদীর ১/১৪৮

এবং যা বর্ণনা করেছেন আবুদ দারদা, সালমান ও ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু মারফু’ স্বরূপঃ

…و ما سكت عنه فهو عفو

যে ব্যপারে চুপ থেকেছে (শারীয়াহ), তা গ্রহণযোগ্য…  (আবু দাউদ ৩৮০০, ইবনু মাজাহ ৩৩৬৭, আল হাকিম ২/৩৭৭, আল বায়হাকী ১০/২১)

আল হাকিম বলেছেন, এ হাদিসটি শাইখানদের (অর্থাৎ শাইখদ্বয় ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম) শর্তসাপেক্ষে সাহীহ। আয যাহাবী তাঁর সাথে একমত পোষণ করেছেন। আল হাইথামী বলেছেন মাজমু’ আল যাওয়াইদ গ্রন্থে ১/৪১৬ঃ একে বর্ণনা করেছেন আল বাযযার; আত তাবারানী তাঁর আল কাবীর গ্রন্থে। আর এর ইসনাদ হাসান। এবং এর বর্ণনাকারীগণ বিশ্বাসযোগ্য।

একে আল আলবানী সাহীহ বলেছেন তাঁর আস সিলসিলাতু আস সাহীহাহ গ্রন্থে (হাদিস ক্রম ২২৫৬)।

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেছেন, আমি আমাদের পূর্ব্বর্তী উলামাবৃন্দ হতে কোন দ্বিমত পাইনি এ ব্যপারে যে –  যার ব্যপারে হারাম হওয়ার কোন দলীল আসেনি সে ক্ষেত্রে তা সাধারণভাবে পরিত্যাগযোগ্য নয়। এ  বিষয়ে লেখালেখি অনেক – যাতে উসুলুল ফিকহ (অর্থাত ফিকহের আসল বা মূল) আর তার শাখা প্রশাখা বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আর কেউ কেউ একে ইজমা’ হিসেব করে বিশ্বাস করেছেন, অথবা এমন ধারণা করেছেন যা বিশ্বাসের ন্যায়। (মাজমু’ আল ফাতাওয়া ২১/৫৩৮)

[১০] বুখারী ১৩৭, মুসলিম ৩৬১, আব্দুল্লাহ ইবন যাইদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদিস হতে।