মূলঃ আব্দুর রাহমান বিন নাসির আস-সাদী
অনুবাদঃ মুহাম্মাদ আসিম উল্লাহ নাবিল ইবন মুহিব
সংশোধন ও পুনঃনিরীক্ষণঃ আবু হাযম মুহাম্মাদ সাকিব চৌধুরী বিন শামস আদ দীন আশ শাতকানী

ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তাঁর জন্যই সকল সুন্দর নামসমূহ ও সকল পরিপূর্ণ  গুণাবলী ও নেয়ামত।
মুহাম্মদ(ﷺ)এর উপর সালাম প্রেরণ করছি, যাকে প্রেরণ করা হয়েছে দ্বীন,  দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গলের জন্য। অতঃপরঃ

দ্বীনের হুকুম এবং ঈমানের ভিত্তি বা মূলনীতি সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে এটি একটি সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা। প্রয়োজনীয় ও অপরিহার্যতা এই মূলনীতিগুলো জানতে প্রশ্নোত্তর আকারে (সংকলনের জন্য উৎসাহ দিয়েছে) যা বুঝের কাছাকাছি এবং জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষা দানের জন্য অধিকতর নিকটবর্তী।

প্রথম প্রশ্নঃ তাওহীদের সংজ্ঞা কি? এর প্রকারভেদ সমূহ কি কি?

উত্তরঃ তাওহীদের সংজ্ঞা তার সকল প্রকারভেদকে সম্মিলিত করে, তা(প্রকারভেদ সমূহ) হলঃ একজন ব্যক্তির জ্ঞান, দৃঢ় বিশ্বাস, ঈমানকে চেনা, আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস প্রতিটি গুণাবলীর পরিপূর্ণতা সহকারে। সুতরাং, তাওহীদ হলঃ এই বিশ্বাস রাখা যেঃ তাঁর কোন শরীক নেই। তাঁর পরিপূর্ণতায় কোন সমকক্ষতা নেই। তিনিই সমস্ত সৃষ্টির সকল ইবাদতের অধিকারী একমাত্র ইলাহ। অতঃপর, তাঁর সকল ইবাদতের মধ্যে তাঁকে এক করা।

সুতরাং,এ সংজ্ঞার মধ্যে প্রবেশ করেছে তাওহীদের তিনটি প্রকারভেদঃ

প্রথমতঃ (তাওহীদ রুবুবিয়্যাহ):  যা হল রবকে একক ভাবে নেওয়ার বুঝ তাঁর সৃষ্টি করার ক্ষমতায়, তাঁর অন্ন দানের ক্ষমতায়, পরিচালনায় এবং প্রতিপালনে।[1]

দ্বিতীয়তঃ (তাওহীদ আসমা ওয়াসসিফাত):  যা হল এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে সুন্দরতম নামসমূহ আল্লাহর যা সবকিছু আল্লাহ নিজের জন্য স্থাপিত করেছেন ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (ﷺ)ও স্থাপিত করে গেছেন।  এইসব গুণাবলী বিশ্বাস করতে হবে কোনরূপ তুলনা, উদাহরণ দেওয়া, পরিবর্তন বা অস্বীকার করা ব্যাতীত।[2]

তৃতীয়তঃ (তাওহীদ আল ইবাদাহ): যা হল আল্লাহকে একক করা ইবাদাত এবং তার সকল প্রকারভেদে। কোনরূপ শরীক করা ব্যতীত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদত করা। তাওহীদের এই প্রকারভেদ গুলোর মধ্যে সবগুলো আঁকড়ে ধরা বা এসবের উপর স্থাপিত হওয়া ছাড়া বান্দা তাওহীদবাদী হয় না।[3]

দ্বিতীয় প্রশ্নঃ ঈমান, ইসলাম ও তাদের প্রধান ভিত্তিগুলো কি কি?

উত্তরঃ  ঈমান হল দৃঢ বিশ্বাস যা কিছু আল্লাহ ও  তাঁর রসূলের আদেশ করেছেন তার সব কিছুর উপর। তা স্বীকার করা এ অনুযায়ী কাজের সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে, যা হচ্ছে ইসলাম। আর ইসলাম (অর্থাৎ এর সংজ্ঞা) হচ্ছে এক আল্লাহর নিকট সমর্পণ করা এবং আনুগত্যতায় পরিচালিত হওয়া।

এর মূলে ভিত্তিগুলোর অন্তর্ভুক্তি হল পবিত্র আয়াতের অনুরূপঃ

“তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা, অন্যান্য নবীকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, তৎসমুদয়ের উপর। আমরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী”। সূরা বাকারাহ (২:১৩৬)

এছাড়াও নবী (ﷺ)ও  হাদীস জিব্রীলে ব্যাখ্যা করেনঃ  “ ঈমান হল আল্লাহকে ও তাঁর মালাঈকা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূল, শেষ দিন, তাকদীরের ভাল ও খারাপে বিশ্বাস করা। ইসলাম হল এই সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। এবং সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমাদানে সিয়াম পালন করা ও আল্লাহর ঘরে হজ করা ”। [4]

সুতরাং, ঈমানকে ব্যাখ্যা করেছেন অন্তরের বিশ্বাস স্বরূপ এবং ইসলামকে ব্যাখ্যা করেছেন শরীয়তের বাহ্যিক প্রতিষ্ঠা স্বরূপ।

তৃতীয় প্রশ্নঃ আল্লাহর নাম ও  গুণাবলীর সম্পর্কিত ঈমানের স্তম্ভগুলো  কি কি?

উত্তরঃ এগুলো(স্তম্ভ) হল তিনটিঃ

– আল্লাহর সকল সুন্দরতম নামসমূহের সবগুলোর প্রতি ঈমান।
– সে ঈমান রাখা যা কিছু তাঁর সকল গুণাবলীর প্রতি নির্দেশ করে।
– তাঁর গুণাবলীর হুকুমে বিশ্বাস করা এবং যা কিছু তার সাথে সম্পর্কিত।
আমরা বিশ্বাস করি তিনি আল আলিম (সর্বজ্ঞানী) যাঁর রয়েছে পরিপূর্ণ জ্ঞান। যা সকল কিছু পরিবেষ্টনকারী তিনি আল-কাদির (ক্ষমতাধর), যার রয়েছে মহান ক্ষমতা, যার দ্বারা তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতা রাখেন। তিনি আর রাহমান (পরম দুয়ালু, অসীম দয়াময়), যিনি আর রাহীম (অসীম দয়ার অধিকারী) এবং তার এই দয়া তিনি যাকে খুশি দান করেন।  এরূপেই বাদ বাকি সুন্দর নাম এবং গুণাবলী সমূহ এবং এদের সাথে সম্পর্কিত বিষয় সমূহ।

 

 

এ পর্ব থেকে আমরা যা শিখলাম

–      তাওহীদ হলঃ এই বিশ্বাস রাখা যেঃ আল্লাহর একত্ববাদে কোন শরীক নেই। তিনিই সমস্ত সৃষ্টির সকল ইবাদতের অধিকারী একমাত্র ইলাহ।

–   তাওহীদের এই শাখাগুলোর মধ্যে রয়েছে রবকে একক ভাবে মেনে নেয়া,  আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ যা সবকিছু আল্লাহ নিজের জন্য স্থাপিত করেছেন তা মেনে নেয়া ও  কোনরূপ শরীক করা ব্যতীত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদত করা।

–      ঈমান হল দৃঢ বিশ্বাস যা কিছু আল্লাহ ও  তাঁর রসূলের আদেশ করেছেন তার সব কিছুর উপর। এগুলো হল আল্লাহকে ও তাঁর মালাঈকা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূল, শেষ দিন, তাকদীরের ভাল ও খারাপে বিশ্বাস করা।  আর ইসলাম (অর্থাৎ এর সংজ্ঞা) হচ্ছে এক আল্লাহর নিকট সমর্পণ করা এবং আনুগত্যতায় পরিচালিত হওয়া। এবং সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমাদানে সিয়াম পালন করা ও আল্লাহর ঘরে হজ করা।

–      আল্লাহর নাম ও  গুণাবলীর সম্পর্কিত সকল সুন্দরতম নামসমূহের সবগুলোর প্রতি ঈমান রাখার আবশ্যকতা। এই ঈমান রাখা যা কিছু তাঁর সকল গুণাবলীর প্রতি নির্দেশ করে। তাঁর গুণাবলীর হুকুমে বিশ্বাস করা এবং যা কিছু তার সাথে সম্পর্কিত।

[1] এ সম্পর্কিত কুরআনের দলীল হলঃ “আল্লাহ সর্বকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর দায়িত্ব গ্রহণ করেন”। (সূরা যুমার ৩৯:৬২)। জাহেলিয়ার যুগে মক্কার কুরাইশদের বিশ্বাস সম্পর্কে কুরআনে এসেছেঃ “বলুনঃ সপ্তাকাশ ও মহা-আরশের মালিক কে? তারা বলবেঃ আল্লাহ”। (সূরা মু’মিনুন ২৩:৮৬-৭)
[2] আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য ইলাহ নেই। সব সৌন্দর্যমন্ডিত নাম তাঁরই”। (সূরা ত্বা-হা ২০:৮)। “কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন, সব দেখেন”। (সূরা আশ-শুআরা ৪২:১১)
[3] আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে”। (সূরা গাফির ৪০:৬০) “আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাক”। (সূরা নাহল ১৬:৩৬)
[4] সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈমান ১/২৭। সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান ১/৩৬।