মূলঃ শাইখ মুহাম্মাদ বিন জামীল যাইনু
ব্যাখ্যা সংকলনঃ আবু হাযম মুহাম্মাদ সাকিব চৌধুরী বিন শামস আদ দীন আশ শাতকানী
স্বত্বাধিকারীর অনুমতিদাতাঃ যুলফিকার ইবরাহীম মেমোন আল আথারী।

ব্যাখ্যা সংকলনঃ

 

৩।الصدق (সিদক, অর্থ সত্যবাদিতা)

 

আবু মুহাম্মাদ আলী ইবনু হাযম বলেন, সিদক হচ্ছে কোন বিষয় সম্পর্কে অবহিত করা, যার উপর তা স্থাপিত।

(الإحكام في أصول الإحكام, শাইখ আবু মুহাম্মাদ আলী ইবনু হাযম, পৃষ্ঠা ৩৬, দার আল আথার)

শামসুদ্দিন আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়্যাহ বলেন, সিদকঃ বিশেষ করে কোন কিছুর বাস্তবতার নাম এর অর্জনের ক্ষেত্রে অথবা এর অস্তিত্বের ক্ষেত্রে।

সিদক হচ্ছে কোন কিছু অর্জন করা এবং তার পুরোটাই, এর পরিপূর্ণ শক্তি এবং এর সকল ভগ্নাংশের সমন্বিত করন।

(مدارج السالكين, শামসুদ্দীন আবি আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন কায়্যিম আল জাওযিয়্যাহ, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৩, দার তাইবাহ)

 

শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি বলেন,

সিদকঃ এটি কোন বক্তব্যের অনুসরণ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে, এবং প্রকাশ্য এবং গোপনের একাত্বতা।

সিদক কাযিব (كذب , মিথ্যাচার) এর বিপরীত এবং এর মূল অতীতকাল বা ভবিষ্যতের বক্তব্যে নিহিত, এর সংঘটন আত্মনির্ভর অথবা অন্যের উপর। মূলতঃ এটি খবরের সাথে সম্পর্কযুক্ত আবার কখনো তা অন্য কোন কিছুতে নিহিত আর তার সংঘটন আত্মনির্ভর।

(شرح شروط لا إله إلا الله, শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি, পৃষ্ঠা ৯০, মাক্তাবাতু দারিল হিজায)

 

এ আলোচনার প্রেক্ষিতে তা হচ্ছে  لا الاه الا الله কে অন্তর দ্বারা সত্যায়িত করা আর (একই সাথে) মুখের বক্তব্যকে অন্তরের সাথে সংযুক্ত করা । সুতরাং কেউ যদি একথা তার মুখে স্বীকার করে কিন্তু অন্তর দ্বারা সত্যায়িত না করে তবে সে منافق (মুনাফিক, অর্থ কপট, তবে ইসলামিক পরিভাষায় মুনাফিকেরা অমুসলিম), মিথ্যুক।  আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:

أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لا يُفْتَنُونَ

وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ

আলিফ-লাম-মীম। মানুষ কি মনে করে যে, আমরা ঈমাণ এনেছি, একথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করে অব্যাহতি দেয়া হবে? আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম; আর আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী।  (২৯ঃ১-৩)

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ

يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ

فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ

আর মানুষের মধ্যে এমন লোক আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহর উপর এবং বিচার দিবসের উপর ঈমান এনেছি, অথচ তারা মোটেই ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহ ও মু’মিনদের সঙ্গে প্রতারণা করে, প্রকৃত অর্থে তারা নিজেদের ব্যতীত আর কারও সঙ্গে প্রতারণা করে না, অথচ তারা এ সম্বন্ধে বোধই রাখে না। তাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, উপরন্তু আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাদের জন্যে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে যেহেতু তারা মিথ্যা বলতো। (২ঃ৮-১০)

 

এবং আল্লাহ মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন তাদের তাঁর বক্তব্যের মাঝে آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ (আমরা আল্লাহর উপর এবং বিচার দিবসের উপর বিশ্বাস এনেছি) এ বক্তব্যের মাধ্যমে وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ (অথচ তারা মোটেই বিশ্বাসী নয়।)

এটি এ কারণে যে যখন আল্লাহ দেখালেন তাদের হৃদয়ে কি ব্যধি রয়েছে, আর সেটি হলো তারা তাদের মুখের বক্তব্যকে সংযোগ করেনি অন্তরের সাথে, আর তারা কাফিরদের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য।  এবং তাদের বাসস্থান হবে আগুণের (জাহান্নামের) সর্বনিম্ন স্তরে।

 

আনাস ( رضي الله عنه ) এর বরাতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন,

ما من احد يشهد ان لا الاه الا الله و ان محمدا رسول الله صدقا من قلبه الا حرمه الله على النار

এমন কেউ নেই যে এই সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল সত্যবাদিতার সাথে তার অন্তর হতে এ ব্যতীত যে আল্লাহ্‌ তাকে জাহান্নামের আগুণের জন্যে হারাম করে দিয়েছেন। (বুখারী ১২৮, মুসলিম ৩২)

সুতরাং রাসুলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) শর্ত দিয়েছেন এই যে আগুণ (জাহান্নাম) থেকে রক্ষা পাওয়া এই বাক্যের মাধ্যমে তখনই সম্ভব যখন কেউ সেটা উচ্চারণ করবে হৃদয়ে তাঁর সত্যায়নের সাথে। সুতরাং কারুর হৃদয়ের সংযোগ ব্যতীত  শুধু মৌখিক স্বীকৃতি তাঁর জন্যে কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না।

উদাহরণ স্বরূপ সেই বেদুঈনের হাদিস, যেখানে সে নবী (صلى الله عليه وسلم) এর কাছে এলো এবং ইসলামের স্তম্ভ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলো, যার সর্বোচ্চ হচ্ছে এই বাক্য لا إله الا الله । নবী (صلى الله عليه وسلم) তাকে এ ব্যপারে জানালেন । তখন সেই বেদুঈন বললো, আমার উপর কি আর কিছু (করনীয়) রয়েছে? তিনি বললেন, না, ঐচ্ছিক কাজ (নফল) ব্যতীত। সে বললো, আল্লাহর কসম! আমি এর চাইতে না কিছু বেশী করবো, না কিছু কম করবো। তখন রাসুলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বললেন, সে সফল হয়েছে যদি সে সত্য বলে থাকে।

সুতরাং নবী (صلى الله عليه وسلم) সাফল্যের জন্যে ঐ ব্যক্তির সত্যবাদী শর্ত দিলেন । সুতরাং তা থেকে বেরিয়ে গিয়েছে كاذب (মিথ্যুক) এবং  منافق (মুনাফিক), কেননা সে কখনই সফলকাম হবে না। বরঞ্চ তাঁর জন্যে রয়েছে হতাশা এবং ধ্বংস। আল্লাহ রক্ষা করুন এসব থেকে।

 

সিদকের শাখাঃ

শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি বলেন,

সিদক সবচাইতে বড় ইবাদাত, দীনের স্থাপন এবং ইমানের শাখার ন্যায় যা أصل (আসল, অর্থ মূল) এবং كمال (কামাল, অর্থ পরিপূর্ণ), এ দুভাগে বিভক্ত। বস্তুতঃ আসল ব্যতীত ইমান সঠিক নয়, আর ইসলাম কবুল করা এর সত্যায়নের উপর নির্ভর করে। আর যে আসল কে তরক করে সে কাফির এবং তার সাথে কোন দীন নেই। কামাল সিদকের অনেক স্তর রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ওয়াজিব যা তরক করলে তরককারী গুনাহগার হয় কিন্তু তার উপর কোন তাকফির হয় না। আবার এর মধ্যে রয়েছে মুস্তাহাব। তাওহীদপন্থীরা এ স্তরের ভিতর পড়েছে। এই প্রকার, অর্থাৎ পরিপূর্ণ – তিনটি স্তরের মধ্যেঃ নিজ নফসের প্রতি যে অত্যাচার করে, কম অগ্রসর, ভালো কাজে অগ্রগামী ব্যক্তি। আর এরা সকলেই আসলের ক্ষেত্রে সঠিক ঈমান এবং ইসলাম সম্পন্ন।

الأصل في الصدك (সিদকের ক্ষেত্রে মূল)ঃ এটি সম্পর্কযুক্ত তাওহীদ, এর বাণী, এর ব্যপারে সিদক এবং এর বক্তব্যে সিদক এর সাথে।

الكمال في الصدك (সিদকের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণতা)ঃ এটি সম্পর্কযুক্ত দীনের কোন একটি বিষয়ের সাথে যেক্ষেত্রে এর দ্বারা আমল করা হয় এবং এতে ইয়াকিন করা হয়। একারণেই সিদ্দিক হচ্ছেন তিনি যিনি তাঁর বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করবেন তাঁর আমলের মাধ্যমে আর আহলে ঈমানেরা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা দেয় সিদকের পরিপূর্ণতা সত্যায়নের ক্ষেত্রে। তাই মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ হচ্ছে সিদ্দিক, এর পর সুদুক এবং এর পর সাদিক।

আর এর ভিত্তিতেই রয়েছে ঈমান অনুযায়ী সিদক বেশি বা কম থাকা।

ইবন রাজাব উল্লেখ করেছেন كلمة الإخلاص গ্রন্থে, “আর যারা আগুনে প্রবেশ করবে এই কালিমা উচ্চারণকারীদের মধ্য হতে, তা একান্তই তাদের এ বক্তব্যের ক্ষেত্রে সিদকের স্বল্পতার কারনে। কেননা যদি এ কালিমাকে সত্যাসত্য ভাবে ধারন করা হয় তবে তা অন্তরকে পবিত্র করে দেবে আল্লাহ্‌ ব্যতীত সকল কিছু হতে। আর যখন অন্তরে রয়ে যাবে কোন প্রকার রেশ আল্লাহ্‌ ব্যতীত, তবে তা এই বক্তব্যের ব্যপারে সিদকের কমতি হতে। আর যে সত্য বলেছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর উচ্চারনের ক্ষেত্রে সে তাঁকে ব্যতীত আর কাউকে ভালোবাসেনা, তাঁকে ব্যতীত আর কাউকে চায় না, আল্লাহকে ব্যতীত আর কাউকে ভয় করেনা, আল্লাহ্‌ ব্যতীত আর কারুর উপর আস্থা রাখে না। ”

ইবন তাইমিয়্যাহ منهاج السنة গ্রন্থেঃ সিদ্দিক শব্দটি দ্বারা কখনো সিদকের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণতা নির্দেশ করা হয়, কখনো সত্যায়নের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণতা নির্দেশ করা হয়।

(شرح شروط لا إله إلا الله, শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি, পৃষ্ঠা ১৯২-১৯৩, মাক্তাবাতু দারিল হিজায)

 

সিদকের প্রকারভেদঃ

শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি বলেন,

১। الصدك قلبي (আস সিদক কালবী, অন্তরের সিদক)ঃ আর এটি রয়েছে অন্তরের বক্তব্য এবং কাজে। আর এটিই সিদকের মূল এবং ভিত্তি।

২। الصدك قولي (আস সিদক কাউলী, বক্তব্যের সিদক)ঃ আর এটি উচ্চারণে।

৩। الصدك عملي (আস সিদক আমালী, আমল বিষয়ক সিদক)ঃ  এটি রয়েছে ক্রিয়া এবং বাহ্যিক অঙ্গ প্রতঙ্গের কাজে।

এর উদাহরণের মধ্যে রয়েছে ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্বপ্নের সত্যায়ন।

قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا

তুমি বাস্তবায়ন (অনুবাদকঃ শাব্দিক অর্থে সত্যায়ন) করেছ তোমার স্বপ্নকে। (৩৭ঃ১০৫)

আর এ ব্যপারে তাঁর সত্যায়ন তাঁর কাজ এবং উদাহরণ স্থাপন এবং নির্দেশনার প্রতি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বক্তব্যঃ

والفرج يصدق ذلك أو يكذبه

আর গোপনাংগ হয় এ ব্যপারে সত্যায়ন করবে অথবা মিথ্যাচার করবে।

আর এ সত্যায়ন হচ্ছে যিনা করা।

(شرح شروط لا إله إلا الله, শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি, পৃষ্ঠা ১৯৩-১৯৪, মাক্তাবাতু দারিল হিজায)

 

(অনুবাদকঃ এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত পড়তে হলে পড়ুন ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়্যাহ এর مدارج السالكين)

 

 

الكذب في التوحيد (আল কাযিব ফিত তাওহীদ, আল্লাহর একত্ববাদে মিথ্যা)ঃ

সিদকের তরক করবার সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়টি দু প্রকারঃ

ক। التكذيب (আত তাকযিব, মিথ্যায়ন)ঃ এটি التصديق (আত তাসদিক, সত্যায়ন) এর বিপরীত, যা (অর্থাৎ আত তাসদিক) কবুল করার সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং এর বিপরীত হচ্ছে আত তাকযিব যা ধর্মত্যাগের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

খ। النفاق (আন নিফাক, কপটতা)ঃ এ বিষয়ে পরবর্তীতে আসছে।

 

 

(চলবে)