মূলঃ শাইখ মুহাম্মাদ বিন জামীল যাইনু
ব্যাখ্যা সংকলনঃ আবু হাযম মুহাম্মাদ সাকিব চৌধুরী বিন শামস আদ দীন আশ শাতকানী
স্বত্বাধিকারীর অনুমতিদাতাঃ যুলফিকার ইবরাহীম মেমোন আল আথারী।

ব্যাখ্যা সংকলনঃ

 

 

৬। قبول (কবুল, অর্থ- স্বীকার করা)

 

শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি বলেন,

কবুলের অবস্থান বিষয়ে দুটো মূল রয়েছেঃ

১। الأخذ و اللزوم (গ্রহন করা এবং লেগে থাকা)ঃ যেমন আপনি বলেন, “আমি উপহার গ্রহন করেছি এবং নিয়েছি। এবং গ্রহন করেছি আদেশসমূহ যদি এর দ্বারা আমি গ্রহন করি।” এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণীঃ

فَتَقَبَّلَهَا رَبُّهَا بِقَبُولٍ حَسَنٍ

অতঃপর তাঁর প্রভু তাঁকে উত্তমরূপে কবুল করলেন। (৩ঃ ৩৭)

অর্থাৎ তাঁকে গ্রহন করলেন। আর তাঁর বক্তব্যঃ

أُوْلَئِكَ الَّذِينَ نَتَقَبَّلُ عَنْهُمْ أَحْسَنَ مَا عَمِلُوا

ওরাই হচ্ছে তারা যাদের নিকট হতে তারা যেসব সুন্দর কাজ সমূহ করে তা কবুল করা হয়। (৪৬ঃ১৬)

অর্থাৎ একে গ্রহন করা। আল্লাহ এ সকল আমল কবুল করেন – এর অর্থ হচ্ছে গ্রহন করেন।

 

২। الرضاء و ميل النفس (নাফসের সন্তুষ্টি এবং পছন্দ)ঃ আপনি বললেন, কোন কিছুকে গ্রহন করলাম যদি সন্তুষ্ট হই, এবং কোন কিছুকে গ্রহন করলাম যদি এর দ্বারা সন্তুষ্ট হই।

শারীয়াতে কবুল এ দুটো অর্থের সমন্বয়েঃ কোন বিষয়কে গ্রহন করা এবং তার সাথে লেগে থাকা, তার উপর সন্তুষ্টির, এর প্রতি নাফসের পছন্দের সাথে এবং এর বিরোধিতা, এর বিরুদ্ধাচরন এবং একে পরিত্যাগের বিপরীত।

 

কবুলের শারয়ী সংজ্ঞা এবং আকিদাগত ইস্তিলাহঃ

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বাণীটির ক্ষেত্রে কবুলের অর্থ সাক্ষ্যদ্বয় যা কিছু নির্দেশ করে তাকে কবুল করা। হোক তা এ সাক্ষ্যদ্বয়ের সংশ্লিষ্ট অথবা এ সাক্ষ্যদ্বয় দ্বারা নির্দেশিত। আর এটি একে গ্রহন করবার, এতে লেগে থাকা ও একাত্মতা পোষণ করবার মাধ্যমে এবং এর প্রতি সন্তুষ্টি, এর প্রতি আত্মসমর্পনের মাধ্যমে এবং এ সাক্ষ্যদ্বয় হতে ফিরে না যাওয়া, এর বিরোধিতা অথবা এর প্রতি বিরক্তি পোষণ করা এবং একে চ্যালেঞ্জ করা ব্যতীত।

এমনিভাবে এ সাক্ষ্যদ্বয়ের কবুল করবার মধ্যে রয়েছে আল্লাহ এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম হতে যা কিছু নাযিল হয়েছে তাকে কবুল করা, তার সাথে একাত্মতা পোষণ করা, তাতে সন্তুষ্ট হওয়া, এর কোন কিছু হতে হটে না যাওয়া। আর তা অন্তুরের আত্মসমর্পন, নম্রতা, শারীয়াতের কাছে এর পরাজয় এর মাধ্যমে এবং এর আত্মসমর্পন যা কিছু আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলﷺ হতে যা কিছু এসেছে তার ব্যপারে এবং তাতে সন্তুষ্টি।

(সংক্ষেপিত, شرح شروط لا إله إلا الله, শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি, পৃষ্ঠা ৩১৫-৩১৬, মাক্তাবাতু দারিল হিজায)

 

আল্লাহ বলেন,

إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ

وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُو آلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَجْنُونٍ

যখন তাদেরকে বলা হতো যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মা’বুদ নেই তখন তারা অহংকার করতো। এবং বলতো আমরা কি এক পাগল কবির কথায় আমাদের মা’বুদদেরকে বর্জন করবো? (৩৭ঃ৩৫-৩৬)

وَكَذَلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِمْ مُقْتَدُونَ

قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكُمْ بِأَهْدَى مِمَّا وَجَدْتُمْ عَلَيْهِ آبَاءَكُمْ

অনুরূপ তোমার পূর্বে কোনো জনপদে যখনই কোনো সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখনই ওর সমৃদ্ধশালী ব্যাক্তিরা বলতঃ আমরাতো আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি এক মতাদর্শের উপর এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। সে (সতর্ককারী) বলতঃতোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদের যে পথে পেয়েছ আমি যদি তোমাদের জন্যে তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট পথ-নির্দেশ আনয়ন করি তবুও কি?(তোমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরন করবে?)  (৪৩ঃ২৩-২৪)

 

বরঞ্চ তারা অস্বীকার করেছে অহংকারের সাথে এবং বলেছে:

قَالُوا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ

তারা বলতঃ তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছ আমরা তা প্রত্যাখান করি।(৪৩ঃ২৪)

 

সুতরাং আল্লাহ لا إله الا الله  উচ্চারণে তাদের অহংকার এবং তা নিয়ে যারা (অর্থাৎ রাসুলগণ) আগত হয়েছেন তাদের ব্যপারে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার কারণে এই বাক্যকে তাদের আযাবের কারণ করেছেন।  সুতরাং তারা পরিত্যাগ করেনি যা তারা অস্বীকার করেছিল এবং তারা স্বীকার করেনি যা তাদের প্রমাণ করা হয়েছিল। বরঞ্চ তারা অস্বীকার করেছে অহংকারের সাথে এবং বলেছে:

أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ

وَانْطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْهُمْ أَنِ امْشُوا وَاصْبِرُوا عَلَى آلِهَتِكُمْ إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ يُرَادُ

مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلَاقٌ

সে কি বহু মা’বুদের (পরিবর্তে) এক মা’বুদ বানিয়ে নিয়েছে? এতো এক আশ্চর্যের ব্যাপার! তাদের প্রধাণরা সরে পড়ে এই বলেঃ তোমরা চলে যাও এবং তোমাদের দেবতাগুলোর পূজোয় তোমরা অবিচলিত থাকো। নিশ্চয়ই এই ব্যাপারটি উদ্দেশ্যমূলক। আমরা তো পূর্বের ধর্মে এরুপ কথা শুনিনি; এটা এক মনগড়া উক্তি মাত্র।(৩৮ঃ৫-৭)

 

এবং তারা বলল:

وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُو آلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَجْنُونٍ

এবং বলতো আমরা কি এক পাগল কবির কথায় আমাদের মা’বুদদেরকে বর্জন করবো? (৩৭ঃ৩৬)

 

সুতরাং তারা আল্লাহর ব্যপারে মিথ্যা কথা বলল, আর আল্লাহ তাদের উত্তর দিলেন রাসুলুল্লাহﷺ এর উদাহরণ দিয়ে

بَلْ جَاءَ بِالْحَقِّ وَصَدَّقَ الْمُرْسَلِينَ

বরং সে তো সত্য নিয়ে এসেছে এবং সমস্ত রাসুলকে সত্য বলে স্বীকার করেছে।(৩৭ঃ৩৭)

 

এর পর তাদের মর্যাদা সম্বন্ধে বলেছেন যারা স্বীকার করে নিয়েছে,

إِلَّا عِبَادَ اللَّهِ الْمُخْلَصِينَ

أُولَئِكَ لَهُمْ رِزْقٌ مَعْلُومٌ

فَوَاكِهُ وَهُمْ مُكْرَمُونَ

فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ

তবে তারা নয় যারা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা। তাদের জন্য নির্ধারিত আছে রিযিক-ফলমূল এবং তারা হবে সম্মানিত। থাকবে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতে। (৩৭ঃ৪০-৪৩)

 

 

কবুলের স্থান ও তার রুকন সমূহঃ

শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি বলেন,

কবুলের স্থান হচ্ছে অন্তর এবং জিহ্বা। এর রুকন সমূহ এ দুটির সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং তা কাজের মধ্যে আবশ্যকীয়।

 

 

কবুলের রুকন সমূহঃ

১। القبول القلبي الباطن (অন্তর সংক্রান্ত অদৃশ্য কবুল)ঃ আর তা হচ্ছে একমত হওয়া, সন্তুষ্ট হওয়া, আত্মসমর্পন করা, সত্যায়িত করবার পর যা দ্বারা কবুল করা হয় তাতে আনন্দিত হওয়া।

অন্তর সঙ্ক্রান্ত অদৃশ্য কবুল দু প্রকারঃ

ক। যা কিছু অন্তরের বক্তব্যের সাথে সম্পর্কযুক্তঃ আর তা হচ্ছে সত্যায়ন, জ্ঞাত হওয়া, ইয়াকিন এবং শোনা।

খ। যা কিছু অন্তরের কাজের সাথে সম্পর্কযুক্তঃ আর তা দাঁড়িয়ে আছে একমত হওয়া, আত্মসমর্পন করা, সন্তুষ্ট হওয়া, আন্তরিক উত্তর দেওয়া এবং স্বীকার করা।

 

২। القبول القولي الظاهر (বাহ্যিক বক্তব্যের মাধ্যমে কবুল)ঃ আর তা কবুল করবার বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া এবং জিহ্বা দ্বারা নিকটবর্তী হওয়া।

 

৩। القبول العملي الظاهر (বাহ্যিক কাজের মাধ্যমে কবুল)ঃ বাহ্যিক কাজের মাধ্যমে কবুল করা বাহ্যিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে কাজ করবার সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর এ কাজ কবুলের অন্তর্ভূক্ত নয়, বরং তা এর আবশ্যিকতা এবং নির্দেশনা হতে। অর্থাৎ মানুষ কবুল করবে অন্তর এবং জিহ্বা দিয়ে। আর যদি সে কবুল করে তবে তার এই কবুল আবশ্যিক করে তার বাহ্যিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে আত্মসমর্পন করানোকে এবং এভাবে তার কবুল করা কে প্রকাশ করাকে।

 

 

قبول عملي (কাবুল আমালি বা কর্ম সংক্রান্ত কবুল) কি বিদ্যমান?

কর্ম সংক্রান্ত কবুল প্রকাশ্য এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ফুদাইল ইবনু ইয়্যাদ বলেন,

     الإيمان عندنا: الإقرار باللسان و القبول بالقبول و العمل

আমাদের কাছে ঈমানঃ জিহ্বা দ্বারা একমত হওয়া, অন্তর দ্বারা কবুল করা এবং কর্ম। আল লালাকায়ী এ কথা বর্ণনা করেছেন।

আর কর্ম শুধুমাত্র কবুলের অংশ নয়, বরঞ্চ তা এর আবশ্যিকতা এবং এর দ্বারা নির্দেশ হতে। এর অর্থ মানুষ তার অন্তর এবং জিহ্বা দ্বারা কবুল করবে, আর যদি সে কবুল করে, তবে তার এই কবুল আবশ্যিক করবে তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে আত্মসমর্পণ এবং এদের উপর কবুল করাকে প্রদর্শন করাকে।

সুতরাং যদি কবুলকে সাধারনভাবে দেখা হয়, তবে তাতে অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কাজ অন্তর্ভুক্ত নয়। আর এটিই মূল আর অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কাজ এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। যদি না একে মুকায়্যিদভাবে দেখা হয়, অর্থাৎ বলা হয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কবুল অথবা কাজের কবুল।

 

قبول العملي (আমল সংক্রান্ত কবুল) এর উদ্দেশ্য মূলতঃ আত্মসমর্পণঃ

قبول العملي (আমল সংক্রান্ত কবুল)ঃ তা হচ্ছে আত্মসমর্পণ এবং নতি স্বীকার যা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের আমল দ্বারা কায়িম হয়। আর তা ঈমানের রুকন, যা ব্যতীত ঈমান সঠিক হয় না। 

 

কবুল করা আত্মসমর্পনকে আবশ্যিক করেঃ

সত্যবাদীর সত্যকে কবুল করা আত্মসমর্পণ এবং আমলকে আবশ্যিক করে। আর আত্মসমর্পনে শামিল হয়েছে নম্রতা প্রদর্শন, ফারদ আমলসমূহ সম্পাদন, শারীয়াত মোতাবেক শাসন, দীন আঁকড়ে ধরে রাখা এবং তাওহীদ অনুযায়ী আমল করা। আর যা কিছু আত্মসমর্পনের অংশ তাই কবুল দ্বারা নির্দেশিত এবং এর জন্যে আবশ্যিক, সুতরাং এসব এতে প্রবেশ করে আবশ্যিকতা এবং আঁকড়ে ধরবার দিক হতে। উদাহরণ স্বরূপ তার বক্তব্য, যাকে কোন কিছু উপহার দেওয়া হয় – সে এটিকে কবুল করা হিসেবে বর্ণনা করে না যা সে গ্রহন করে না। যদি বলা হয় এমন যে জিহ্বা দ্বারা উচ্চারিত শব্দে হাদিয়াহ গ্রহন করা হয়েছে, কিন্তু তা যদি কোন প্রকার ওজর ব্যতীত উপহার গ্রহন করতে অপারগতার সাথে হয়, তবে তাকে এই উপহারের কবুলকারী বলা হয় না।

এ কথার উপর ভিত্তি করে কবুল সঠিক হয় না আমল ব্যতীত, তা আমরা আমল কবুলের মধ্য হতে বলি বা এর জন্যে আবশ্যিক হিসেবেই বলি। আর কবুলের সম্পর্ক এবং স্থান অন্তরে আর এর জন্যে আমল করা আবশ্যিক। আমল ব্যতীত কবুল সঠিক হয় না। আর আমলের অস্তিত্ব ব্যতীত কবুল সত্যায়িত হয় না। তাই কোন প্রকার সন্দেহ এবং পার্থক্য নেই এতে যদি আমরা বলিঃ ঈমানের মূল অন্তরে আর অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কাজ এর দ্বারা নির্দেশিত এবং এর জন্যে আবশ্যিক। আর এ ব্যতীত ঈমান সঠিক হয় না এবং কবুলও করা হয় না, যতক্ষণ এর ফলাফল একই হচ্ছে আর তা হচ্ছে আমল ও আত্মসমর্পন তরক করবার কুফর। যেভাবে শাইখুল ইসলাম ঈমানের ব্যপারে বলেছেন।

 

কবুলের শর্তের সাথে বাকি শর্তসমূহের সম্পর্কঃ   

সত্য এবং পরিপূর্ণ কবুল যা শারীয়াস্বরূপ বর্ণনাকৃত তা অন্য সকল শর্তকে আবশ্যিক করে, যেভাবে অন্য শর্তগুলো একে আবশ্যিক করে আর এতে দাবী রাখে। হয়ত কখনো কখনো কিছু শর্তকে কবুল ব্যতীত পাওয়া যায় আর কখনো কবুল করাকে পাওয়া যায় কিন্তু অন্য শর্ত সমূহকে পাওয়া যায় না। এ দুটো অবস্থাতেই তা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর ধারককে উপকার পৌঁছায় না, বরঞ্চ তা এর সুস্থতার জন্যে আবশ্যিক অন্য শর্তসমূহকে বিনষ্ট করে দেয়।

অর্থাৎ, তাওহীদের সত্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু কবুল করা যথেষ্ট নয়, যদি এতে বাকি সকল শর্ত সমূহ বিন্যাস্ত না হয়।

আপনাদের জন্যে এই কাঈদাহ বুঝবার জন্যে কিছু উদাহরন পেশ করছিঃ

১। কখনো হয়ত কোন বান্দা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কে কবুল করেছে, কিন্তু সে এর প্রতি আত্মসমর্পন করে না এবং এই কবুল যেসব বিষয়ের দিকে নির্দেশ করে, সে সব বিষয়ের উদ্দেশ্যে সে কাজও করে না। আর এই অবস্থায় তার কুফরকে বলা হয় كفر الإعراض (কুফর আল ই’রাদ, অনীহার কুফর), كفر الإمتناع و التولي (কুফর আল ইমতিনা’ ওয়াল তাওয়ালী, বারণ করবার এবং ছেড়ে দেওয়ার কুফর)। আর এর উল্টোটি হলো যদি কেউ আত্মসমর্পন করে কবুল করা ব্যতীত, আর সে ক্ষেত্রে তা হলো كفر النفاق (কুফর আন নিফাক, কপটতার কুফর) আর তা বাহ্যিক আত্মসমর্পন যা ইসলামের (আত্মসমর্পনের) বাহ্যিক প্রদর্শন এবং তা গোপন কবুল নয়, বরং তা কুফর এবং বিরোধিতাকে গোপন করে।

২। কখনো হয়ত বান্দা তাওহীদকে সাধারণভাবে গ্রহন করে, কিন্তু অজ্ঞতা বা মূর্খতা পোষণ করে, সুতরাং সে তা জানেনা অথবা সে এর নির্দেশিত বিষয় বা এর সত্যাসত্যের ব্যপারে সন্দেহ পোষণ করে। আর এটি কবর পূজারী মূর্খ, অজ্ঞ এবং আমাদের জমানার অনেক মুশরিকদের হালের মত।

আর এর বিপরীত হল, কখনো হয়ত এ ব্যপারে (অর্থাৎ তাওহীদের ব্যপারে) ইয়াকিন রাখে এবং এ সম্বন্ধে জানে, কিন্তু একে কবুল করে নেয় না। আর এটি كفر العناد (কুফর আল ‘ইনাদ, বা জেদের বশে কুফর) হতে, যেমন আরবদের এবং অন্যান্যদের অধিকাংশ কাফিরেরা।

৩।কখনো হয়ত তাওহীদ ভালোবাসে, কিন্তু তা গ্রহন করে না, যেমন হিরাকল (হিরাক্লিয়াস) এবং আবু তালিব।

আবার কখনো গ্রহন করে কিন্তু ভালোবাসে না, এতে সত্যায়ন করে না। আর এরাই হচ্ছে মুনাফিকেরা।

৪। কখনো কবুল করে কিন্তু ইখলাস রাখে না আর এরা হচ্ছে মুশরিকেরা।

 

যে সকল বিষয়ের উপর কবুল করতে হবে এবং এতে যা কিছু অন্তর্ভূক্তঃ

১। তাওহীদকে কবুল করা, অর্থাৎ বান্দা আল্লাহর ألوهية (উলুহিয়্যাহ অর্থাৎ ইলাহ হিসেবে একত্ববাদ) মেনে নেবে, এর দ্বারা আল্লাহকে আলাদা করে নেবে এবং তার ربوبية (রুবুবিয়্যাহ অর্থাৎ রব হিসেবে সৃষ্টি, রাজত্ব এবং পরিচালনায় আল্লাহর একত্ববাদ) এবং এ সকল বিষয়ে আল্লাহর তাওহীদ বা একত্ববাদ মেনে নেবে।

২। موحد (মুওয়াহহীদ বা তাওহীদবাদী) মুহাম্মাদﷺ এর রিসালাত (পৌঁছিয়ে দেওয়া ঐশী বাণী ) এবং এর দ্বারা যা নির্দেশিত এবং এর শেষ হওয়ার বিষয়ে কে কবুল করবে।

৩। ইসলামকে এবং এর মধ্যে যা কিছু আদেশ এবং নিষেধ রয়েছে তাকে কবুল করবে। এবং এ সকল বিষয়কে দীন স্বরূপ স্বীকার করবে, এর দিকে দাওয়াত দেবে, এর দ্বারা বিচারক নিয়োগ করবে, এবং এর দ্বারাই বিচার করবে।

৪। আল কুরআনকে কবুল করবে, এতে ঈমান আনবে, এতে যা কিছু আছে তা দ্বারা আমল করবে এবং এর দ্বারা বিচার করবে।

৫। আল্লাহ নিজের সম্বন্ধে যা কিছু বলেছেন সে সকল বিষয় কবুল করবে এবং তার সত্যায়ন করবে।

৬। الولاء و البراء (আল ওয়ালা ওয়াল বারা’আ , বন্ধুত্ব এবং মুক্ত হওয়া বা শত্রুতা করা) বিষয়ক আকিদাকে কবুল করে নেবে, মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তাদের সাহচর্য ভালবাসবে। মুসলিমদের নেতাদের প্রতি আনুগত্য পোষণ করবে, মুশরিক হতে মুক্ত হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে।

৭। এ পর্যন্ত যা কিছু বলা হয়েছে, তার সকল কিছু সে মুখে উচ্চারণ করবে, এতেই থাকবে যতক্ষণ না সে মুসলিম হিসেবেই মৃত্যু বরণ করে, আল্লাহর দেখা পায়, আর সে পারঙ্গম, কোন প্রকার পরিত্যাগ অথবা বদল করা ব্যতীত।

৮। আর কবুলের মধ্যে আরও প্রবেশ করেছে এ সকল বিষয়ের ব্যপারে সন্তুষ্টি এবং ভালোবাসা পোষণ করা।

(সংক্ষেপিত, شرح شروط لا إله إلا الله, শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি, পৃষ্ঠা ৩২৫-৩৩০, মাক্তাবাতু দারিল হিজায)

 

 

কিছু সংশয় নিরশনঃ

(এ অংশে সকল উত্তর অত্যন্ত সংক্ষেপে দেওয়া হয়েছে। এ সকল বিষয়ে ভবিষ্যতে বিস্তারিত লিখবার ইচ্ছা রাখি ইনশা আল্লাহ)

 

সংশয় ১ঃ

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কি মুখে উচ্চারণ না করে অর্থাৎ স্বীকার না করে কেবল অন্তরে স্বীকার করলে কেউ মুসলিম প্রতিপন্ন হবে?

রাসুলুল্লাহﷺ বলেন,

من قال لا إله إلا الله صدقاً من قلبه دخل الجنة

যে উচ্চারণ করলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সত্যবাদিতার সাথে তার অন্তর হতে, সে জানাতে প্রবেশ করলো।

(مسند ابي يعلى, আবু ইয়া’লা মুহাম্মাদ বিন আল হুসাইন আল ফাররা, খন্ড ৬, পৃষ্ঠা ১০)

 

তিনি আরও বলেন,

أمرت أن أقاتل الناس حتى يشهدوا أن لا إله إلا الله، وأن محمدا رسول الله، ويقيموا الصلاة ويؤتوا الزكاة

আমাকে আদেশ করা হয়েছে লোকেদের সাথে যুদ্ধ করতে যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা এই সাক্ষ্য দেয় যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, সালাত আদায় করে যাকাত প্রদান করে।

(صحيح البخاري, আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল আল বুখারী, হাদিস ১৩৯৯)

উপরোক্ত হাদিস সমূহ থেকে প্রমাণিত হয়, শাহাদাতের বাণী দুটি অবশ্যই উচ্চারণ করতে হবে, শুধু মনে কবুল করা যথেষ্ট নয়।

 

শাইখ তাকি উদ্দিন ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন,

আর শাহাদাত দুটির ব্যপারে, যদি তাদের ক্ষমতা থাকা স্বত্বেও উচ্চারণ করা না হয়, তবে সে সকল মুসলিমদের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কাফির। আর সে কাফির যাহির ভাবে এবং বাতিন ভাবে উম্মতের পূর্ব্বর্তীগণ এবং ইমামদের মতে।

(مجموعة الفتاوى, তাকি উদ্দিন আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ৬০৯)

 

সংশয় ২ঃ

যদি কোন ব্যক্তি শুধু মুখে কবুল করে কিন্তু আমল করে না, তবে সে ক্ষেত্রে তার কবুল কি যথেষ্ট হবে?

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কবুল করবার শর্তের মধ্যে রয়েছে এতে আমৃত্যু কায়েম থাকা এবং এ অনুযায়ী আমল করা।

আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেন,

ما من عبد قال لا إله إلا الله ثم مات على ذلك إلا دخل الجنة

বান্দাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে বলবে, “নেই কোন উপাস্য আল্লাহ ব্যতীত”, এর পর এর উপর মৃত্যু বরন করবে, এ ব্যতীত যে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

(মুসলিম ১৫৪)

এ থেকে প্রমানিত হলো কবুল করবার পর এতে কায়েম থাকা এবং তাওহীদের উপর মৃত্যু ব্যতীত জান্নাতে প্রবেশ করা যাবে না।

 

আল্লাহর রাসুল ﷺ আরও বলেন,

فوالله الـذي لا إلــه غـيره إن أحــدكم ليعـمل بعمل أهل الجنه حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع فيسبق عليه الكتاب فيعـمل بعـمل أهــل النار فـيـدخـلها . وإن أحدكم ليعمل بعمل أهل النار حتي ما يكون بينه وبينها إلا ذراع فــيسـبـق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل الجنة فيدخلها

অতএব, আল্লাহর কসম-যিনি ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ্ নেই-তোমাদের মধ্যে একজন জান্নাতবাসীর মত কাজ করে – এমনকি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক হাত ব্যবধান থাকে, এ অবস্থায় তার লিখন তার উপর প্রভাব বিস্তার করে বলে সে জাহান্নামবাসীর মত কাজ শুরু করে এবং তার ফলে তাতে প্রবেশ করে।

এবং তোমাদের মধ্যে কোন এক ব্যক্তি জাহান্নামীদের মত কাজ শুরু করে দেয়- এমনকি তার ও জাহান্নামের মধ্যে মাত্র এক হাত ব্যবধান থাকে, এ অবস্থায় তার লিখন তার উপর প্রভাব বিস্তার করে বলে সে জান্নাতবাসীদের মত কাজ শুরু করে আর সে তাতে প্রবেশ করে।

(বুখারী ৩২০৮, মুসলিম ২৬৪৩)

উপরোক্ত হাদিস থেকে প্রমানিত হয় তাকদীরের লিখন সত্ত্বেও কোন মানুষ অসৎ কাজের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করবে না বা সৎ কাজের মাধ্যমে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। বরঞ্চ জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশের জন্যে রাসুলুল্লাহ মুহাম্মাদ ﷺ এর উম্মতের শর্ত হচ্ছে তাওহীদ কবুল করবার সাথে সাথে তার আমল, অর্থাৎ কোন ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুখে স্বীকার করা স্বত্বেও যদি সৎ আমলকে পরিত্যাগ করে তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

(পুনশ্চঃ এ সকল বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত লিখবার ইচ্ছা রাখি ইনশা আল্লাহ।)

 

 

كفر الرد (কুফর আর রাদ, পরিত্যাগ করবার কুফর)

কবুলের বিপরীত হচ্ছে কুফর আর রাদ, এ বিষয়ে পরবর্তীতে আসছে।