মূলঃ শাইখ মুহাম্মাদ বিন জামীল যাইনু
ব্যাখ্যা সংকলনঃ আবু হাযম মুহাম্মাদ সাকিব চৌধুরী বিন শামস আদ দীন আশ শাতকানী
স্বত্বাধিকারীর অনুমতিদাতাঃ যুলফিকার ইবরাহীম মেমোন আল আথারী।

ব্যাখ্যা সংকলনঃ

 

৫। المحببة (মুহাব্বাহ, অর্থ ভালোবাসা)

এ মহান এবং বরকতময় বাক্যের প্রতি ভালবাসা, এবং যা কিছু এ বাক্যটিতে (لا إله الا الله ) ফরমান দেওয়া হয়েছে এবং যা কিছু এ বাক্যটি নির্দেশ করে। এবং ভালোবাসা তাদের প্রতি যারা এ বাক্যের প্রয়োগ করে, আঁকড়ে ধরে এর শর্তসমূহকে, একই সাথে ঘৃণা পোষণ করে যা কিছু একে বাতিল করে এবং এর (বাতিলকারী) গোত্রকে।

আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذْ يَرَوْنَ الْعَذَابَ أَنَّ الْقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا وَأَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعَذَابِ

এবং মানবমন্ডলীর মধ্যে এরুপ কিছু লোক আছে-যারা আল্লাহর মোকাবেলায় অপরকে সমকক্ষ স্থির করে, আল্লাহকে ভালোবাসার ন্যায় তারা অপরকে ভালোবেসে থাকে এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে-আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসা দৃঢ়তর এবং যারা অত্যাচার করেছে তারা যদি শাস্তি অবলোকন করতো, তবে বুঝতো যে, সমুদয় শক্তি আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর। (২ঃ১৬৫)

 

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ

হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্য কেউ তার দীন হতে যদি ফিরে যায়, তবে আল্লাহ্‌ অতি সত্বর (তাদের স্থলে) এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুমিনদের প্রতি হবে নম্র, কাফিরদের প্রতি হবে কঠোর, তারা জিহাদ করবে আল্লাহর রাস্তায় এবং তারা নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করবে না।  (৫ঃ৫৪)

সুতরাং আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন যে তাঁর সেসব বান্দারাই বিশ্বাসী যাদের ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি দৃঢ়তর। এটা এরূপ কেননা তাদের কেউ তাঁর (আল্লাহর) সাথে তাঁর ভালোবাসায় কোন অংশীদার স্থাপন করেন না যেভাবে আল্লাহকে ভালোবাসার (তথাকথিত) মুশরিক দাবীদারেরা দাবী করে থাকে, যারা গ্রহণ করেছে (আল্লাহ ব্যতীত) নিদ এবং তারা তাদের ভালোবাসে ঠিক যেভাবে তারা ভালোবাসে আল্লাহকে।

আর বান্দার তার রবের প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ হচ্ছে সে তার রবের প্রতি ভালোবাসাকে প্রাধান্য দেবেন যদিও তা তার প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যায়। আর সে ঘৃণা করবে যা তার রব ঘৃণা করেন যদিও তা তার প্রবৃত্তির পক্ষে যায়। এবং সে সুসম্পর্ক স্থাপন করবে তার সাথে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করেছে, আর শত্রুতা স্থাপন করবে যারা তাদের (আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের) সাথে শত্রুতা স্থাপন করেছে।  এবং সে اتباع (ইত্তিবা’, শাব্দিক অর্থ অনুসরণ করা ) করে আল্লাহর রাসুল  (صلى الله عليه وسلم) কে।

(অনুবাদক: اتباع (ইত্তিবা’, শাব্দিক অর্থ অনুসরণ করা ) পারিভাষিক অর্থের সংজ্ঞায় ইমাম আহমেদ ইবন হানবাল বলেছেন,

الإتباع ان يتبع الرجل ما جاء عن النبي صلى الله عليه و سلم و عن اصحابه, ثم هو من بعد في التابعين مخير

اتباع (ইত্তিবা’,) হচ্ছে কোন এক ব্যক্তি তাই অনুসরণ করবে যা নবী (صلى الله عليه وسلم) হতে প্রাপ্ত এবং যা তাঁর সাহাবি বর্গ হতে প্রাপ্ত, এর পর  তাদের মনোনীত  التابعين (তাবিঈ, শাব্দিক অর্থ অনুসরণকারী। বস্তুত তারা সাহাবাদের ছাত্র) অনুসরণকারীগণকে ।

(إعلام الموقعين, ইবন কুদামাহ আল মাকদিসি, খন্ড:২ পৃষ্ঠা:১৮১ )

এ সকল আলামতই (আল্লাহকে) ভালোবাসার শর্ত, যাদের একটিও বাদ দিলে (আল্লাহর প্রতি) ভালোবাসা বিদ্যমান রইবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:

أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا

আপনি কি দেখেছেন তাকে যে তার প্রবৃত্তিকে ইলাহ স্বরূপ গ্রহন করেছে? এর পরও আপনি কি তার জিম্মাদার হবেন?  (২৫ঃ৪৩)

আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:

لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحٍ مِنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ 

আপনি পাবেন না এমন কোন কাওমকে যারা আল্লাহর এবং শেষ দিনের উপর বিশ্বাস রাখা সত্ত্বেও  আল্লাহ্‌ এবং তার রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের ভালোবাসে। যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই বা আত্মীয় হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ্‌ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদের সাহায্য করেছেন তার তরফ হতে রুহ দ্বারা। এবং তিনি তাদের প্রবেশ করাবেন  জান্নাতে, যার তলদেশ দিয়ে নহর বয়ে যায়। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ্‌ তাদের উপর সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের উপর। তারাই আল্লাহর দল। এটা কি নয় যে আল্লাহর দলই সফলকাম।(৫৮ঃ২২)

সুতরাং আল্লাহ তাঁর বিশ্বাসী (মুমিন) বান্দাদের ব্যপারে এই বলেছেন যে তারা বরঞ্চ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসাতেই দৃঢ়তর। আর তারা আল্লাহ কে ভালবাসে আর তিনি তাদের ভালবাসেন। এবং তারা ভালোবাসেনা তাদের যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচারী হয়, যদিও তারা তাদের পরম নিকটজন হয়। এবং এ থেকে জানা যায় বিরুদ্ধাচারীরা আপন করে নেয়না তাদের ব্যতীত যারা তাদের দীনের অন্তর্ভূক্ত এবং তাদেরই অংশ। সুতরাং তারা অবিশ্বাসীদেরই (কাফিরদের) অংশ।

আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ 

ও তোমরা যারা বিশ্বাসী, তোমরা ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের বন্ধু স্বরূপ গ্রহন করোনা, তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, নিশ্চিতভাবে সে তাদের মধ্য হতে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ জালিম কাওমকে হিদায়াত দেন না।  (৫ঃ৫১)

আনাস ( رضي الله عنه ) এর বরাতে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন,

ثلاث من كن فيه وجد بهن حلاوة الايمان: ان يكون الله و رسوله احب اليه مما سواهما, وان يحب المرء لا يحبه الا لله, و ان يكره ان يعود في الكفر بعد اذ انقذه الله منه كما يكره ان يقذف في النار

যে কারুর এ তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকবে সে বিশ্বাসের (ঈমানের) মিষ্টত্ব আস্বাদন করবে: নিশ্চিতভাবে আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুল তার নিকট অন্য যেকোন কিছুর অপেক্ষা প্রিয়তর হবে, সে যদি কাউকে ভালবাসে তবে তা আল্লাহর কারণ ব্যতীত আর কোন কারণে নয়, এবং আল্লাহ তাকে অবিশ্বাস (কুফর) হতে রক্ষা করবার পর সে অবিশ্বাসে (কুফরে) ফেরত যেতে ঘৃণাবোধ করবে ঠিক সেভাবে যেভাবে সে ঘৃণা করে আগুনে (জাহান্নামে) নিক্ষিপ্ত হওয়াকে।

 

 

মুহাব্বাতের প্রকারভেদঃ

শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি বলেন,

মুহাব্বাতের প্রকারভেদঃ

 

১। المحبة الطبعية العادية الفطرية (মুহাব্বাহ যা ফিতরাগত প্রকৃতির অনসুরনে) ঃ

যেমন বাবা, সন্তান, ধন সম্পত্তির প্রতি ভালোবাসা। এবং এ ধরনের মুহাব্বাতে নেই কোন প্রকার মহত্ত্ব, নমনীয়তা, স্বাধীন অনুসরণ, ইবাদাতগত নম্রতা ইত্যাদির আবশ্যিকতা। কিন্তু বাবার প্রতি নমনীয়তা এবং তার প্রতি দয়ার পাখনা বিছিয়ে দেওয়া এবং তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা – এ সকলই আল্লাহর প্রতি , তাঁর আদেশের প্রতি  সম্মান প্রদর্শন করা, এবং তাঁকে মান্য করা কেননা এ সকল উপস্থিত যা আল্লাহ আদেশ করেছেন। এর পর এ সকল বিষয় পরিপূর্ণ এবং খালিস সম্মান নয় (কেননা তা কেবল আল্লাহর প্রাপ্য)।

(সংকলকঃ লক্ষ্য করুন আল্লাহ্‌ বলছেনঃ

وَقَضَى رَبُّكَ أَلاَّ تَعْبُدُواْ إِلاَّ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاهُمَا فَلاَ تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلاَ تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا

এবং আপনার রব আপনাকে এ হুকুম দিয়েছেন যেন আপনি তাঁকে ব্যতীত অপর কাউকে ইবাদাত করবেন না এবং আপনার পিতা-মাতার প্রতি দয়াসুলভ সদাচার করবেন। যদি তাদের কোন একজন অথবা উভয়েই আপনার জীবদ্দাশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের প্রতি উফ শব্দটিও উচ্চারণ করবেন না এবং তাদের তিরস্কার করবেন না, বরঞ্চ তাদেরকে বলুন সম্মানসূচক বক্তব্য।(১৭ঃ২৩)

আল্লাহ্‌ এ আয়াতে পিতা-মাতার ক্ষেত্রে যে আদেশ করেছেন তা মুসলিম এবং অমুসলিম সকল পিতা-মাতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের বন্ধন অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, ঠিক তেমনিভাবে অন্যান্য সম্পর্ক, যেমন ভাই-বোন, খালা, মামা, চাচা – এ সকল সম্পর্কই প্রাকৃতিক।)

 

২। المحبة التعبدية (ইবাদাত সংক্রান্ত মুহাব্বাহ)ঃ

আর এটি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা যাতে সংশ্লিষ্ট নম্রতা, নমনীয়তা, নিরাপত্তার আশ্রয় সন্ধান, আশা করা, ভয় করা, আর্জি করা ইত্যাদি সকল বিশেষ করে আল্লাহর জন্যে এবং অন্যের জন্যে তা উদ্দেশ্য করা জায়িয নয় এবং তা অন্যের জন্যে করা হয় না।

 

(সংকলকঃ আল্লাহ্‌ বলেছেনঃ

وَالَّذِينَ آمَنُواْ أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ

আর যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহর প্রতি ভালবাসায় প্রচন্ড।(২ঃ১৬৫))

 

৩। المحبة اللزومية (আবশ্যকীয় মুহাব্বাহ)ঃ

আর এটি হচ্ছে সে ভালোবাসা যা আল্লাহর মাঝে এবং আল্লাহর জন্যে। আর এটি ইবাদাত সংক্রান্ত মুহাব্বাতের সাথে আবশ্যকীয় এবং এর কারণেই। আর তা হচ্ছে এমন ভালোবাসা যা আল্লাহ্‌ ভালোবাসেন তাঁকে মান্য করা এবং ভালো বিষয় হতে। এবং ভালোবাসা আল্লাহর মাঝে এবং আল্লাহর কারণে। এবং এ ভালোবাসা আল্লাহর ওয়ালীদের জন্যে, এবং মুমিন বান্দাদের প্রতি যেমন রাসুল, ফেরেশতা এবং সালেহ বান্দাদের প্রতি। এবং এ প্রকার মুহাব্বাহ আল্লাহর কারনে বন্ধুত্ব এবং আল্লাহর কারনে শত্রুতা, এবং এটি ব্যতীত ইসলাম পরিপূর্ণ হয়না। এবং তা ঈমানের সবচাইতে শক্তিবহ শর্ত।

 

(সংকলকঃ আল্লাহ্‌ বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ

ও তোমরা যারা বিশ্বাস এনেছ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসুলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের আমলসমূহকে ধ্বংস করে দিও না।

(৪৭ঃ৩৩)

অর্থাৎ আমলসমূহ ধ্বংস না হবার একমাত্র শর্ত হলো আল্লাহর এবং আল্লাহর নবীর অনুসরণ করা।

 

আবার আল্লাহ্‌ বলেনঃ

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমাকে (অর্থাৎ আল্লাহর রাসুলকে) অনুসরণ কর, আল্লাহ্‌ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ পরম ক্ষমাকারী, পরম দয়ালু।(৩ঃ৩১)

সুতরাং আল্লাহকে ভালোবাসলে অবশ্যই রাসুলকে অনুসরণ করতে হবে, নতুবা আল্লাহকে ভালোবাসা হয় না। লক্ষ্য করুন রাসুলকে অনুসরণ কিভাবে করতে হবে সে বিষয়ে আল্লাহ্‌ কি বলছেনঃ

مَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ

যা কিছু রাসুল তোমাদের দেন তা তোমরা গ্রহন কর এবং যা কিছুর ব্যপারে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। (৫৯:৭)

সুতরাং প্রমাণিত হলো যে আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে যা কিছু রাসুল দেন, অর্থাৎ আল কুরআন এবং আস সুন্নাহ হতে, তাকে অবশ্যই পালন করবার মাধ্যমেই এ ব ভালোবাসা প্রমান করতে হবে। শুধু মুখের দাবী এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে এ গ্রন্থের ঈমান অধ্যায়ে আরো আসছে। )

 

৪। المحبة الشركية (শিরকবশতঃ মুহাব্বাহ)ঃ

আর এটি নিদ এর প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্যকে ইবাদাতের যোগ্য মনে করা অথবা আল্লাহর সাথে সাথেই অপর কারুর জন্যে (একই প্রকার) ভালোবাসা পোষণ করা, যেভাবে এ কাজ করে থাকে মুশরিকেরা তাদের উপাস্যসমূহের ক্ষেত্রে করে থাকে।

 

(সংকলকঃ আল্লাহ্‌ বলেনঃ

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ

এবং মানুষের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছে যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের নিদস্বরূপ গ্রহন করেছে, তারা তাদের সেভাবে ভালোবাসে যেভাবে তারা আল্লাহকে ভালোবাসে। (২ঃ১৬৫)

এ প্রসঙ্গে ইত্তিবাআ এর অধ্যায় পাঠ করুন, যা সামনে আসছে।)

 

৫। المحبة المحرمة (হারাম মুহাব্বাহ) ঃ

এটি হচ্ছে এমন প্রকার মুহাব্বাহ যাকে আল্লাহ্‌ ভালোবাসেন না, যেমন কুফর, ফিসক, গুনাহ, প্রবৃত্তির অনুসরণ, অথবা কাফিরের প্রতি ভালোবাসা অথবা তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা অথবা আল্লাহর আদেশের ব্যপারে রাগ পোষণ করা দুনিয়া এবং ধন সম্পত্তির ব্যপারে বাড়াবাড়ি পোষণ করা।

(সংকলকঃ এ প্রসঙ্গে এ বইয়ের কুফর, ফিসক, ওয়ালা ওয়াল বারাআ অধ্যায় পাঠ করুন, যা সামনে আসছে। )

এ সকল মুহাব্বাহ বিভিন্ন স্তরের, এর মধ্যে রয়েছে পালনকারীর কুফর (যা ধর্মচ্যূত করে দেয়), আবার এর মধ্যে রয়েছে এমন গুনাহ যা কুফর নয়।

(شرح شروط لا إله إلا الله, শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি, পৃষ্ঠা ২৭০-২৭১, মাক্তাবাতু দারিল হিজায)

 

 

শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি বলেন,

আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বিনষ্ট বা কদর্য হওয়ার কারনসমূহের মধ্যে রয়েছেঃ

১। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি অন্তরে ঘৃণা পোষণ করা, অথবা গালমন্দ করা অথবা তাদের আদেশের ব্যপারে বিদ্বেষ পোষণ করা অথবা ইবাদাতের এমন কাজ করা যা ঘৃণা এবং বিদ্বেষের সাথে।

২। শিরকবশতঃ মুহাব্বাহ পোষণ করা অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অপর কিছুকে আল্লাহর ন্যায় ভালোবাসা।

৩। এমন ভালোবাসা যা আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় সমূহ হতে বিধায় আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করে।

৪। আল্লাহর শত্রুদের প্রতি ভালোবাসা এবং বন্ধুত্ব পোষণ করা।

৫। আল্লাহ যা ভালোবাসেন এবং যে আইন প্রনয়ন করেছেন অথবা কিছু (ওয়াহীর মাধ্যমে) তাদের প্রতি প্রেরণ করেছেন তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করা।

৬। আল্লাহর ওয়ালীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা।

৭। আল্লাহ যা ভালোবাসেন বা যা আদেশ করেছেন তার উপর নিজের প্রবৃত্তিকে প্রাধান্য দেওয়া।

৮। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর (নিকট প্রেরিত ওয়াহীর) অনুসরণ এবং  আত্মসমর্পন করা এবং তার আদেশের উদাহরণ অনুসরণ করবার মাধ্যমে ভালোবাসার অবশ্যিকতা প্রদর্শনের বিপরীত করা।

এ সকল অপছন্দনীয় কাজ বিভিন্ন স্তরের, এর মধ্যে রয়েছে পালনকারীর কুফর (যা ধর্মচ্যূত করে দেয়), আবার এর মধ্যে রয়েছে এমন গুনাহ যা কুফর নয়।

(شرح شروط لا إله إلا الله, শাইখ খালিদ বিন আলী আল মিরদি আল গামিদি, পৃষ্ঠা ২৭৯, মাক্তাবাতু দারিল হিজায)

 

 

 

(كفر البغض و الكره) ঘৃণা এবং অপছন্দের মাধ্যমে কুফর

ভালবাসার বিপরীত হচ্ছে ঘৃণা এবং অপছন্দ। ঘৃণা এবং অপছন্দ মুহাব্বাতকে বিনষ্ট করে দেয়।

আল্লাহ বলেন,

لَقَدِ ابْتَغَوُاْ الْفِتْنَةَ مِن قَبْلُ وَقَلَّبُواْ لَكَ الأُمُورَ حَتَّى جَاءَ الْحَقُّ وَظَهَرَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَارِهُونَ

তারা পূর্বেও ফ্যাসাদ করতে চেয়েছিল, এবং আপনার বিষয় সমূহ উল্টে ফেলেছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না সত্য এল এবং আল্লাহর আদেশ বাস্তব হল। আর তারা ছিল এতে অসন্তুষ্ট। (৯ঃ৪৮)

 

আল্লাহ আরও বলেন,

ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ وَكَرِهُوا رِضْوَانَهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ

এটি একারণে যে তারা অনুসরণ করে তা যা আল্লাহকে ক্রোধান্বিত করে এবং অপছন্দ করে তাঁর সন্তুষ্টিকে। সুতরাং তিনি তাদের আমলসমূহকে ধ্বংস করে দেন।(৪৭ঃ২৮)

এরূপ আরও অসংখ্য আয়াত রয়েছে যাতে এ ধরনের রোগাক্রান্ত লোকেদের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর ওয়াহীকে ঘৃণা বা অপছন্দ করা কুফর। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইসলাম বিনষ্টকারী কারণ সমূহের আলোচনায়।